আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

লাইভস্টক

নাম ধরে ডাকলেই সাড়া দেয় ১১২০ কেজি ওজনের ‘বগুড়ার কিং’

কোরবানির ঈদে এবার আলোচনায় এসেছে ‘বগুড়ার কিং’। শাহিওয়াল ক্রস জাতের ষাঁড়টির ওজন এক হাজার ১২০ কেজি অর্থাৎ ২৮ মণ। এর দাম চাওয়া হয়েছে সাত লাখ টাকা।

গরুটির মালিক জামিল হাসান। তার বাড়ি বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার আটমুল ইউনিয়নের দোপাড়া গ্রামে। শখের বসে গরুটি লালন-পালন করে বড় করে তুলেছেন।

জামিল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, “প্রথমে যখন গরুটি পালন করা শুরু করি তখন অনেকেই বলেছেন, হবে না। তবে আমি চেষ্টা করে গেছি। নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করেছি। আগে কোনো নাম দেয়া না থাকলেও পরে এসে নাম দেয়া হয় ‘বগুড়ার কিং’। নাম ধরে ডাকলে সে সাড়া দেয়।”

সামনে কোরবানির ঈদ। তাই গরুটি দেখতে অনেকেই তার বাড়িতে আসছেন। পাইকাররাও আসছেন। কিন্তু দামে না মেলায় বিক্রি করছেন না জামিল।

‘বগুড়ার কিং’র দাম সাত লাখ টাকা চাওয়ার বিষয়ে জামিল বলেন, ‘গরুটি শাহিওয়াল ক্রস। এর মাংস খুব সুস্বাদু। একে দেশি গরুর মতো প্রাকৃতিক উপায়ে লালন-পালন করা হয়েছে। কোনো ইনজেকশন দেয়া হয়নি।’

এ পর্যন্ত কত দাম উঠেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চার লাখ টাকা পর্যন্ত দাম উঠেছে। কিন্তু চাহিদামতো দাম না হওয়ায় এখনো বিক্রি করিনি। প্রতিদিন বাড়িতে ক্রেতা ও পাইকাররা আসছেন। দামে মিললে ঈদে বিক্রি করব।’

শিবগঞ্জ উপজেলার আটমুল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোজাফফর হোসেন বলেন, জামিল খুব যত্ন করে গরুটি লালন-পালন করেছেন। অনেকেই গরুটি দেখতে আসছেন। গরুটির ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা দাম হওয়ার কথা।

বগুড়ায় জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রফিকুল ইসলাম, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ফেসবুক অনলাইন পশুরহাট বগুড়া ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে বগুড়া পশুর হাট ফেসবুক পেজ থাকবে। ক্রেতারা তাদের পছন্দের পশু এই পেজে গিয়ে কিনতে পারবেন। সেই পেজে ‘বগুড়ার কিং’র ছবিও থাকবে।

লাইভস্টক

ভোলার চরাঞ্চলে মহিষ পালনে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

লেখক

জেলার বিভিন্ন দুূর্গম চরাঞ্চলে মহিষ পালনকে কেন্দ্র করে বিপুল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যবর্তী বিচ্ছিন্ন চরের বাথানে হাজার হাজার মহিষ প্রতিপালন হয়ে আসছে। চরগুলো থেকে দৈনিক শত শত মণ দুধ স্থানীয় বাজার হয়ে পটুয়াখালী, লক্ষীপুর, নোয়াখালী, চট্রগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। এ দুধ দিয়ে স্থানীয়ভাবে সবচে বেশি পছন্দের খাবার টক দৈ তৈরি হয়। যা এখানকার ব্রান্ড হিসেবে পরিচিত। আরো প্রস্তুত হয় মিষ্টি, মাখন, ঘি, পনির, রসমালাই, ছানা, সন্দেসসহ নানান মুখরোচক খাবার।প্রকৃতির সবুজ প্রান্তরের উপর নির্ভর করে এখানে শত শত কোটি টাকার মহিষের বাথান গড়ে উঠেছে নিজস্ব উদ্যোগে। সরকারিভাবে চালু রয়েছে কৃত্রিম প্রজনন ব্যবস্থা। যা জাত উন্নয়নে সহায়তা করছে। সৃষ্টি হয়েছে পিছিয়ে পরা নদী বেষ্টিত এ জনপদের প্রায় ৩৮ হাজার পরিবারের কর্মসংস্থান’র ব্যবস্থা।


এছাড়া সদর উপজেলার ইলিশা এলাকায় মিল্ক ভিটা কোম্পানী মহিষের দুধ সংগ্রহের জন্য একটি প্লান্ট তৈরির কাজ চালাচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে এখান থেকে দৈনিক ৫ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করা হবে। ফলে দুধের দাম কমার আশংকা থাকবেনা। একইসাথে আন্তর্জাতিক খাদ্য পণ্য সংস্থা ফুড এন্ড এগ্রিকালচার অরাগানাইজেশনের সাথে প্রাণি সম্পদ বিভাগের আলোচনা চলছে মহিষের দুধ ব্যাপকভাবে বাজারজতকরণের ব্যপারে। তাই কৃত্রিম প্রজনন, সুষম খাবার নিশ্চিতকরণ, মোটাতাজাকরণ, মহিষ পালনে দক্ষতার প্রশিক্ষণ নিশ্চিতের মাধ্যমে এ শিল্পের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


মহিষের মালিকরা বলছেন, সেই প্রাচীণকাল থেকেই চরাঞ্চলে মহিষ পালনের ইতিহাস জানা যায়। বিশেষ করে এক সময়ে গৃহস্থ সমৃদ্ধ পরিবারগুলোর চরে শত শত মহিষ থাকতো। সেই ধারা এখোনো অব্যাহত রয়েছে। জেলার ৭৩টি ছোট-বড় চরাঞ্চলের বিশাল প্রান্তরে নির্বিঘেœ মহিষের দল বিচরণ করতে পারে, তাই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে এসব বাথানে মহিষ বেড়ে উঠে। মহিষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হওয়ায় রোগ-বালাই কম হয়। এছাড়া প্রায় সারা বছরই গরুর দুধের তুলনায় মহিষের দুধের মূল্য বেশি থাকে। তাই বলা যায় এর চাহিদা বেশি রয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. ইন্দ্রজীত কুমার মন্ডল বাসস’কে জানান, জেলায় প্রায় হাজার কোটি টাকা মূল্যের খামার, বাথান ও পারিবারিকভাবে এক লাখ ২৪ হাজার মহিষ রয়েছে। যা থেকে দৈনিক ৩৫ থেকে ৪০ হাজার লিটার দুধ পাওয়া যায়। মহিষের উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। বর্তমানে মহিষ উন্নয়ন প্রকল্প-২ বাস্তবায়ন রয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে মহিষের জাত উন্নয়নের কাজ চলছে। উন্নত জাতের মুররাহ পুরুষ মহিষের সাথে স্থানীয় দেশি মহিষের কৃত্রিম প্রজনন চলছে। জেলার সদর, মনপুরা ও চরফ্যাসন উপজেলায় কৃত্রিম প্রজনন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এছাড়া সরকার ৫০ ভাগ ভর্র্তুকিতে ৩০ টি উন্নত জাতের মহিষ খামারীদের বিতরণ করেছে।
তিনি আরো বলেন, সদর উপজেলার বাঘমারা এলাকায় সরকারিভাবে ৫০ একর জমির উপর মহিষের আধুনিক খামার গড়ে তোলা হবে। এটি চালু হলে এখান থেকেই উন্নত জাতের মহিষ কিনতে পারবে খামারীরা। যেখানে দেশি জাত থেকে দেড় থেকে দুই লিটার দুধ পাওয়া যায়, সেখানে উন্নত জাত থেকে ৮ থেকে ১০ লিটার দুধ পাওয়া সম্ভব। বাণিজ্যিকভাবে মহিষের মাংসের জন্য মহিষ মোটাতাজাকরণ পক্রিয়ার পরিধি বাড়ানো হয়েছে চরগুলোতে। একইসাথে মহিষ পালনে আমরা খামারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছি।


মহিষের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা। সংস্থাটির সহকারী পরিচালক ডা. মো: খলিলুর রহমান বাসস’কে জানান, মহিষ মূলত প্রাকৃতিক খাাবার খেয়েই বেঁচে থাকে। এ জেলায় ২০১৬ সালে মহিষের মৃত্যুর হার ছিলো ১৪ ভাগ, দুধ উৎপাদন ছিলো গড়ে এক লিটার। আর তা বর্তমানে মৃত্যুর হার দাঁড়িয়েছে ৪ ভাগ ও দুধ আসছে দুই লিটার করে। বলা যায়, মহিষ লালনের অবস্থার উন্নয়ন হচ্ছে এবং সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে ভোলায়। সঠিক কর্ম পরিকল্পনা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ খাতকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
তিনি জানান, গত ৪ বছরে আমরা বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজার খামারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি এবং ৪০টি উন্নত জাতের মহিষ দিয়েছি। ভোলায় বাংলাদেশের মধ্যে সবচে বেশি দুধের দাম পাওয়া যায়। ইন্ডিয়া, নেপাল, পাকিস্তান শুধুমাত্র মহিষ দিয়ে উপরে উঠছে। মহিষের দুধ থেকে এসব দেশ প্রায় ৪০ ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরি করে। আমাদের দেশেও সেসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুধের খাদ্য তৈরির প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। এতে করে দুধের কদর আরো বাড়বে। একইসাথে মহিষ পালনে গতানুগতিক ধারা থেকে বেড় হয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।
ভোলা সদরের মাঝের চরের মহিষের রাখাল খালেক মিয়া ও সবুজ হোসেন বলেন, গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন চরে কৃষকরা দুধ উৎপাদন ও মহিষ মোটাতাজাকরণে আগ্রাহ দেখাচ্ছে। কৃত্রিম প্রজননে জন্ম নেওয়া মহিষের বছুরের বেশ চাহিদা রয়েছে এখা।ে কারণ মহিষ পালনে তেমন যতœ করতে হয়না। অনেকটা প্রাকৃতিকভাবেই তারা বেড়ে উঠে।


দৌলতখান উপজেলার মেঘনা নদীর মধ্যে জেগে উঠা চর মদনপুর। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় চরে ঘুরে বেড়াচ্ছে শত শত মহিষের পাল। চারণভূমিতে জন্মানো সবুজ ঘাসই এদের খাদ্য। খাবার সেরে পানিতে গা ডোবায় এরা মেঘনায় । দিন শেষে রাখাল লাঠি হাতে মহিষের পাল বাথানে নিয়ে আসে। এ চরের একটি বাথানে শতাধিক মহিষ পালন করছেন পৌর শহরের ২ নং ওয়ার্ডের আদর্শ দধি ভান্ডারের মালিক আব্দুল হাইসহ অন্য দুজন। তাদের গত কয়েক পুরুষ ধরেই মহিষ পালনের ঐতিহ্য।
আব্দুল হাই জানান, তারা চরে মহিষ পালনের জন্য ৫৫ কানি জমি লিজ নিয়েছেন এক বছরের জন্য। তিনি এ মহিষের দুধ থেকে টক দই, ঘি মাখন, ঘোল ইত্যাদি উৎপাদন করে বিক্রি করেন। তবে সাম্প্রতিককালে দুধের পরিমাণ কমে গেছে। কারণ হিসেবে বলেন, চরে আবাদি জমির পরিমাণ বাড়ায় মহিষের চারণ ভুমির সংকট দেখা দিয়েছে। ঘাসের উপর নির্ভর করে মহিষের দুধের পরিমান। মাটি থেকে প্রায় ৭ ফুট উচ্চতায় কেল্লা তৈরি করে তারা মহিষ লালন করে আসছেন। বর্ষা বা জোয়ারের পানিতে চর যখন ডুবে যায় তখন কেল্লায় নিরাপদে মহিষ থাকতে পারে।

সদরের কাচিয়া ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের ভবানীপুর গ্রামের মহিষের বাথানের মালিক গোলাম কিবরিয়া বলেন, সদরের কাচিয়ার চর ও দৌলতখানের বৈরাগীর চরে দুটি বাথানে প্রায় সাড়ে ৪’শ মহিষ পালন করছেন তিনি। প্রাণি সম্পদ থেকে উন্নত জাতের একটি চেলা মহিষ পেয়েছেন। যার মাধ্যমে কৃত্রিম প্রজনেন বেশ কিছু মহিষ উৎপাদন হয়েছে তার বাথানে। যার ওজন ও আকৃতি দেশি মহিষের চেয়ে বড় এবং দুধও হয় বেশি। এছাড়া খুরা রোগের জন্য সরকারি ভ্যাকসিনও পেয়েছেন তিনি। তবে মহিষ পালন সমস্যামুক্ত করতে চারণ ভূমির সংকট মোকাবেলায় মহিষের জন্য আলাদা চর নির্ধারণ ও দুূর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আধুনিক কেল্লা নির্মাণের দাবি জানান এ মহিষ মালিক।
ডা. খলিলুর রহমান বলেন, মহিষের মাংস ও দুধ অনেক স্বাস্থ্যসম্মত। গরুর দুধে সর্বোচ্চ ৪ ভাগ ফ্যাট থাকে আর মহিষের দুধে ৮ ভাগ হয় এবং এর জন্যই মিষ্টি, বটার বা অন্যান্য খাদ্য বানানো সম্ভব। এটা নিয়ে আমরা ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছি। এখন খামারীরাও পূর্বের চেয়ে সচেতন হচ্ছে। সব মিলিয়ে এ শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনার কথা জানান তিনি।


জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা আরো বলেন, মহিষের অন্যতম রোগ হলো খুরা রোগ। এর ফলে মহিষের পায়ে ও মুখে ঘা হয় এবং মহিষ মারা যায়। তাই রোগ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ প্রকল্প চালু রয়েছে। সরকারিভাবে বিনামূল্যে ৭ লাখ ৯৫ হাজার ডোজ টিকা গরু-মহিষকে প্রদানের জন্য কাজ চলছে। রাশিয়া থেকে আসা এ টিকার এক ডোজের মূল্যে পড়েছে ১৩১ টাকা। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আমাদের ৬৯জন কর্মী কাজ করছে। আগামী ৫ বছর ধরে এ প্রকল্প চলবে । এতে আশা করা হচ্ছে এ রোগটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

লাইভস্টক

পোল্ট্রিশিল্পের যত সঙ্কট

লেখক

দেশের মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর জন্য মুরগী উৎপাদনের বিকল্প নেই। বেকার সমস্যা দূরীকরণেরও এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা অনস্বীকার্য। আমাদের দেশে পোল্ট্রি শিল্প আশির দশকে শুরু হলেও মূলতঃ ২০০০ সালের পর থেকে এর বিস্তৃতি ঘটে। বর্তমানে এই শিল্পে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় দেড় কোটি লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

এই শিল্পের বিপন্নদশার কারণগুলির মধ্যে রয়েছে চাহিদার তুলনায় অধিক উৎপাদন, বিদেশি কোম্পানিদের অনুপ্রবেশ, শুধুমাত্র রান্নার মাংস হিসেবে ব্যবহার করা, বিদেশে রপ্তানি না করা, উৎপাদিত মুরগীর সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য না থাকা ও রোগ নির্ণয়ের জন্য ডাক্তার-ল্যাবরেটরি না থাকা। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে করোনার প্রভাব, মুরগীর মাংসের উপকারিতা স¤পর্কে ভোক্তার ধারণা না থাকা, মুরগীর খাদ্য, ঔষধ-ভ্যাক্সিন, অন্যান্য উপকরণের অধিক মূল্য এবং বাচ্চা উৎপাদনকারী হ্যাচারী কৃষি ভিত্তিক হলেও ব্যাংক ঋণ ও রেয়াতি মূল্যে বিদ্যুৎ না পাওয়া ইত্যাদি।

প্রোটিনের উৎস হিসেবে উন্নত বিশ্বে যেমন কানাডা, জাপান, আমেরিকায় বছরে একজন মানুষ গড়ে গোশত খায় প্রায় ৪২ থেকে ৪৪ কেজি। মালয়েশিয়ায় প্রতিজন গড়ে বছরে মুরগীর গোশত খাচ্ছে ৪০ কেজি। সেখানে আমাদের দেশে প্রতিজন মুরগীর গোশত খায় বছরে মাত্র ৪ থেকে ৫ কেজি। বর্তমানে দেশে ব্রয়লার এবং লেয়ার বাচ্চা উৎপাদনকারী হ্যাচারীর সংখ্যা প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি। আমাদের দেশে শুধু ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে প্রতিদিন প্রায় ২০ লক্ষ পিস, যা দিয়ে গোশত উৎপাদন হচ্ছে প্রায় তিন হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু প্রতিদিন চাহিদা আছে দুই হাজার মেট্রিক টন। উদ্বৃত্ত থাকছে প্রায় এক হাজার মেট্রিক টন। একারণেই উৎপাদনকারীরা দীর্ঘদিন ধরে ব্রয়লার মুরগীর দাম পাচ্ছে না।

উন্নত দেশের মানুষ আমাদের দেশের তুলনায় মুরগীর গোশত খায় ৮ থেকে ৯ গুণ বেশি, ডিম খায় ৭ থেকে ৮ গুণ বেশি। দেশে মুরগীর গোশত এবং ডিমের চাহিদা এত কম থাকা সত্তে¡ও ভ্রান্তনীতির কারণে ইতোমধ্যে বিদেশি কোম্পানিগুলো দেশে প্রবেশ করে, পোল্ট্রিশিল্প ধ্বংস করার জন্য জোরে-সোরে ব্রয়লার বাচ্চা, ডিম ও কমার্শিয়াল মুরগী উৎপাদন শুরু করেছে।

বর্তমানে ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদন খরচ প্রায় ৩২ টাকা থেকে ৩৩ টাকা হলেও বিদেশি কোম্পানিগুলোর আগ্রাসন এবং অধিক উৎপাদনের কারণে গত প্রায় ৪ বছরের বেশি সময় ধরে ব্রয়লার বাচ্চা বিক্রয় হচ্ছে ১০ টাকা থেকে ২০ টাকায়। এই বিরাট লোকসানের কারণে দেশীয় কিছু হ্যাচারী ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, বাকীগুলো বন্ধ হওয়ার পথে। অনুসন্ধানে মুরগীর গোশত না খাওয়ার কারণ সম্বন্ধে জানা যায়, কোনো এক প্রচার মাধ্যমের অপপ্রচারের জন্য মুরগীর গোশত না খাওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। মুরগীর খাদ্য তথাকথিত ট্যানারী বর্জ্যদ্রব্য দিয়ে প্রস্তুত করা হয়, এ কারণে পোল্ট্রি মুরগী মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। আসলে বিষয়টি কতটুকু সত্য, এটা বিচার-বিবেচনায় আনা হয়নি। কোনো অসাধু ব্যবসায়ী ট্যানারী বর্জ্য ব্যবহার করতে পারে, তার মানে এই নয় যে, তার ধারাবাহিকতা চলছেই। যাই হোক, সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চয়ই এই অসাধু ব্যবসায়ীদের আর এগুতে দেবে না, এটাই আমাদের বিশ্বাস। দেশে প্রতিদিন প্রায় ২০ লক্ষ পিস মুরগী উৎপাদন হলেও রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বা ল্যাবরেটরী নেই। মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বুদ্ধির বিকাশ ঘটাতে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মুরগীর গোশতের মাধ্যমে প্রোটিনের অভাব দূর করা সম্ভব। চাহিদা মতো মুরগীর গোশত খেলে প্রোটিনের অভাব পূরণের মাধ্যমে নিউরোট্রান্সমিটার সঠিকভাবে কাজ করবে। এতে মানুষের বুদ্ধির বিকাশ ঘটবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে, কাজের স্পৃহা বৃদ্ধি পাবে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

গত ২০ বছরে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে মুরগীর খাবার, ভ্যাকসিন, ঔষধ সরঞ্জামাদির দাম ৭ থেকে ১০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া জনশক্তির মূল্য বেড়েছে ৫ থেকে ৭ গুণ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, গত ২০ বছরে মুরগীর চাহিদা না বাড়ায় দামের তেমন কোনো পরিবর্তনই হয়নি। পোল্ট্রিশিল্প রক্ষার্থে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (প্রাণী সম্পদ)কে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের বড় বড় বাচ্চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, হ্যাচারীগুলোকে অবশ্যই শৃংখলার মধ্যে থেকে চাহিদা অনুযায়ী বাচ্চা উৎপাদন করতে হবে, অথবা উৎপাদনের সাথে মিল রেখে মুরগীর গোশত বিদেশে রপ্তানি করতে হবে। দেশের মানুষের মুরগীর গোশত খাওয়ার উপকারিতা সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টির লক্ষ্যে পাঠ্যপুস্তক, সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় জোর প্রচার করতে হবে। শুধু রান্না করে খাওয়া নয়, উন্নত দেশের মতো বিভিন্ন খাবারের সাথে মুরগীর গোশত সংযুক্ত করে দেশে-বিদেশে রপ্তানি করতে হবে।

দেশের বেকার সমস্যা দূরীকরণে পোল্ট্রি শিল্প বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি করে বিদেশে রপ্তানি করলে এই শিল্প প্রসারের সাথে সাথে অনেকাংশে বেকার সমস্যা দূর করাসহ প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এছাড়া মুরগির বিষ্ঠা জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করে ফসলের ফলন বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদেশ থেকে রাসায়নিক সার আমদানি অনেকাংশ কমানো সম্ভব। কাজেই এ শিল্পকে অবহেলার চোখে না দেখে, এখনই সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সুপরিকল্পিতভাবে পোল্ট্রিনীতি বাস্তবায়িত হলে বিপন্নপ্রায় এই শিল্পকে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

বাংলাদেশ

গবাদিপশুকে সুষম খাবার খাওয়ানোর উপকারিতা

গবাদি পশুপালন করে বেশি আয় করতে হলে সুষম খাদ্যের দিকে নজর দিতে হবে। সুষম খাদ্য ছাড়া গবাদিপশু বেশি বৃদ্ধি পায় না।

গবাদিপশুর সুষম খাদ্য বলতে বুঝায় যে খাদ্যে আমিষ, শর্করা, স্নেহ বা চর্বি, খনিজ লবণ, ভিটামিন বা খাদ্যপ্রাণ ও পানি সঠিক অনুপাতে থাকে। গবাদিপশুর বৃদ্ধি ও গঠনে সুষম খাদ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। সুষম খাদ্যের অভাবে পশুর অপুষ্টি দেখা দেয় এবং বিভিন্ন রোগ আক্রমণ করে।

আমিষ বা প্রোটিন জাতীয় খাদ্য অন্ত্রে পরিপাক হয়ে অ্যামিনো অ্যাসিডে পরিণত হয়। পরে তা অন্ত্রে শোষিত হয়ে রক্তে মিশে এবং দেহের ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধি সাধন করে। এ কারণে সব বয়সেই দেহে আমিষের প্রয়োজন থাকে। তবে বাড়ন্ত বয়সে এ চাহিদা থাকে আরো বেশি।

আমিষের সহায়তায় দেহের ভেতরে জৈব অনুঘটক এনজাইম তৈরি হয়। যেমন, পেপসিন, ট্রিপসিন ইত্যাদি। এসব এনজাইম খাদ্যের প্রোটিন, লিপিড ও শর্করাকে ভেঙে সহজপাচ্য পুষ্টিতে রূপান্তরিত করে যা কোষ সহজেই শোষণ ও সদ্ব্যবহার করতে পারে। পশুর দেহের রক্ত, পেশী ও সংযোজক কলার প্রধান অংশই প্রোটিনে গঠিত। খাদ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রোটিন পশু দেহের শক্তি ও চর্বির উৎস হিসেবে কাজে লাগে।

শর্করা পশু দেহে কর্মশক্তি যোগায়। শর্করা খাদ্যান্ত্রে ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয় যা অন্ত্রে শোষিত হয়ে রক্তে মিশে কার্যসম্পাদন করে। অতিরিক্ত শর্করা দেহে গ্লাইকোজেনরূপে জমা থাকে এবং খাদ্যে শর্করার অভাব হলে প্রয়োজনে সেই গ্লাইকোজেন কর্মশক্তি যোগায়।

স্নেহ প্রাণী দেহের টিস্যুর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গবাদিপশুর প্রধানত তাপ ও শক্তির উৎস হিসেবে সঞ্চিত থাকে। সাধারণত গবাদিপশুর দানাদার খাদ্যে শতকরা ৪ ভাগ চর্বি জাতীয় পদার্থ থাকা প্রয়োজন।

খনিজ পদার্থ বাড়ন্ত পশুর নতুন অস্থি ও টিস্যু সৃষ্টিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই উপাদান কঙ্কালের আকৃতি ও দৃঢ়তা বজায় রাখে। পশুর লোম, ক্ষুর ও শিং গঠনে খনিজ পদার্থ প্রয়োজন। খনিজ পদার্থ যেমন- লৌহ রক্তে অক্সিজেন ও কার্বনডাইঅক্সাইড বহন করতে সহায়তা করে। আবার পটাসিয়াম পশুর দেহের তরল পদার্থের অ্যাসিড বেসের সমতা রক্ষা করে।

যেসব জৈব যৌগ খাদ্য উপাদান হিসেবে অল্প পরিমাণ দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য জরুরি তাদের ভিটামিন বলা হয়। প্রাণী দেহের জন্য পর্যাপ্ত আমিষ, শর্করা, স্নেহ ও খনিজ পদার্থ খাদ্যের সাথে সরবরাহ করেও ভিটামিন ছাড়া জীবন চালনা সম্ভব হয় না।

স্বাভাবিক টিস্যুর বৃদ্ধি, দৈহিক বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য ভিটামিন অত্যাবশ্যক। পশুখাদ্যে যদি ভিটামিন না থাকে অথবা সুষ্ঠভাবে ভিটামিন শোষিত না হয় কিংবা দেহে ভিটামিন সদ্ব্যবহার না হয় তবে সুনির্দিষ্ট রোগ হয়। যেমন, ভিটামিন ‘এ’ -এর অভাবে রাতকানা, জনন কর্মক্ষমতা হারানো, ভিটামিন ‘কে’ -এর অভাবে রক্ত জমাট বাঁধতে সমস্যা হয় এবং ভিটামিন ‘ই’ -এর অভাবে জনন অকৃতকার্যতা পরিলক্ষিত হয়।

পশুদেহের শতকরা ৭০ থেকে ৯০ ভাগ পানি। সাধারণত দানাদার খাদ্যে শতকরা ১০ ভাগ ও খড় জাতীয় খাদ্যে শতকরা ১৫ ভাগ পানি থাকে। আবার সবুজ ঘাসে পানির পরিমাণ শতকরা ৯০ ভাগ। পশুখাদ্যে প্রচুর পরিমাণ পানি থাকা সত্ত্বেও পশুকে পৃথকভাবে পানি সরবরাহ করতে হয়। কারণ পানি দেহের কোষের কাঠিন্য ও স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখে। এতে প্রাণিদেহের কাঠামো ঠিক থাকে।

পানি ছাড়া দেহে যেকোনো ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটা সম্ভব নয়। পানি দেহের এক অঙ্গ থেকে অন্য অঙ্গে বিভিন্ন পুষ্টিকারক পদার্থ সরবরাহ করে। তাছাড়া পানি দেহের অতিরিক্ত তাপ শোষণ করে। আবার পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাফার হিসেবেও কাজ করে।

যারা নতুন গবাদি পশুর খামার দিতে চাইছেন তারা পশুকে সুষম খাবার খাওয়ানের দিকে নজর দিতে হবে। তবেই প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবেন।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

লাইভস্টক

সারাদেশে কোরবানি হয়েছে ৯০ লাখ ৯৩ হাজার ২৪২ পশু

ঈদুল আযহায় সারাদেশে মোট ৯০ লাখ ৯৩ হাজার ২৪২টি গবাদিপশু কোরবানি হয়েছে বলে জানিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

শনিবার (২৪ জুলাই) মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. ইফতেখার হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন।

তবে এ বছর কোরবানির জন্য পশু প্রস্তুত ছিল প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার ৭৬৫টি। ঈদের আগে ধারণা করা হয়েছিল যে, এবার কোরবানিতে ৯৯ লাখ ২২ হাজার পশু কোরবানি হতে পারে। সে হিসেবে প্রায় ২০ লাখ গবাদিপশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে ঈদের পর যে হিসাব পাওয়া গেছে সে অনুযায়ী, প্রত্যাশার চেয়ে কম গরু কোরবানি হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বণিক বার্তার প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন যে, যথেষ্ট দাম না পেয়ে পাইকার ও খামারিরা তাদের গবাদি পশু ফেরত নিয়ে গেছেন। অনেকে লোকসানে হলেও বিক্রি করে দিয়েছেন। খামারিরা বলছেন, গবাদি পশু লালন পালন করতে যে খরচ হয়েছে, অনেক সময় সে খরচও উঠে আসেনি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আগেই বলেছিল যে, চাহিদা কমে যাওয়া ও গ্রাম থেকে শহরে পশু আসতে প্রতিবন্ধকতার কারণে এবার গবাদিপশু অবিক্রীত থাকতে পারে। পাশাপাশি কভিডকালে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হওয়া, বাজার ব্যবস্থাপনায় জটিলতা, বিক্রির শুরুতেই কঠোর বিধিনিষেধের কবলে পড়া, বাজার পর্যন্ত গরু পরিবহন করতে না পারা, বড় শহর থেকে গ্রাম পর্যায়ে পাইকারি ব্যবসায়ী কম যাওয়া, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়াসহ নানা কারণে বিপণন ব্যবস্থায় এবার জটিলতা তৈরি হয়েছে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

বাংলাদেশ

শিক্ষক বিপ্লবের শখের বশে কবুতর পালন

কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের পানজোরা গ্রামের বাসিন্দা মো. বিপ্লব হোসেন। উপজেলার এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের পাশেই দোতলা বাড়ি। এলাকায় তাকে বিপ্লব মাস্টার বলেই ডাকেন সবাই। শিক্ষকতা করেন উপজেলার প্রাচীন বিদ্যাপীঠ সেন্ট নিকোলাস উচ্চ বিদ্যালয়ে।

আজ থেকে প্রায় ২১ বছর আগে নিতান্তই শখের বসে কবুতর পালন শুরু করেন শিক্ষক বিপ্লব। তিনি তখন ৮ম শ্রেণির ছাত্র। যে স্কুলে পড়তেন এখন তিনি সেখানেই শিক্ষকতা করেন। বাবা-মায়ের দেয়া টিফিনের খরচের টাকা থেকে বাঁচিয়ে স্থানীয় বাজার থেকে মাত্র ৪ জোড়া কবুতর কেনেন। সেই কবুতর আস্তে আস্তে সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু একদিন রাতে তার শখের কবুতরগুলো বাঘডাসে খেয়ে ফেলে। ভেঙ্গে যায় কিশোর বিপ্লবের স্বপ্ন।

ছাত্রাবস্থায় অতিরিক্ত কোন পয়সা ছিল না তার হাতে। তাই হঠাৎ করেই থেমে যায় শখের কবুতর পালন। কিন্তু সহজে থেমে যাওয়ার পাত্র নন বিপ্লব। বেশ কয়েক বছর বন্ধ রেখে ২০১৮ সালে নতুন করে নিজের বাড়ি তৈরির পর ছাদের ওপর ঢেউটিনের ছাউনিতে ৬ জোড়া কবুতর দিয়ে গড়ে তোলেন বর্তমান কবুতর খামারটি। এখন তার শেডে শোভা পাচ্ছে প্রায় ১০০ জোড়া কবুতর। সেই শখের কবুতর পালনে এখন আয় করার পাশাপাশি পরিবারের পুষ্টি চাহিদাও মিটছে বেশ।

সরেজমিনে পানজোরা গ্রামে শিক্ষক বিপ্লব হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দোতলা বাড়ির ছাদে একটি কাঠ ও ডেউটিন দিয়ে দুই সাইডে তৈরি কবুতরের ঘর। ভিতরে বসানো হয়েছে প্রায় শতাধিক কবুতরের খোপ। আকারে বড় বিদেশি কবুতরগুলোর জন্য রয়েছে আলাদা লোহার খাঁচা। নিচে দেয়া আছে খাবার ও স্বচ্ছ পানি।

কবুতরগুলো প্রয়োজন মতো যে যার মতো করে খাবার খাচ্ছে, আবার উড়ে গিয়ে বসছে নিজের কামরাতে। সেখানে বসে কেনোটা ডিমে তা দিচ্ছে। কোনোটা নিজের বাচ্চাকে খাইয়ে দিচ্ছে। আবার কেউ অপরের সাথে হট্টগোলে ব্যস্ত। কেউ বা আবার দলবলে সাঁতার কাটছে।

একটি সাধারণ কবুতর বছরের ১২ মাসে ১৩ জোড়া বাচ্চা দিলেও উন্নত জাতের কবুতর সাধারণত বছরে ৩ জোড়ার বেশি বাচ্চা দিতে পারে না। তবে শিক্ষক বিপ্লব তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ১ জোড়া উন্নত জাতের কবুতরের পাশে ৫ জোড়া ফোস্টার কবুতরের সঙ্গে একটি নির্ধারিত সময়ে ডিম পরিবর্তনের মাধ্যমে বছরে কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ জোড়া উন্নত জাতের কবুতরের বাচ্চা উৎপাদন করছেন।

কবুতর চাষের শুরুতে শিক্ষক বিপ্লব মাত্র ৩৪ হাজার টাকা বিনিয়োগ করলেও এখন তার শখের কবুতর ফার্মে মূলধনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। আর বর্তমানে ১০০ জোড়া কবুতর চাষে মাসে প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা ব্যয় করে তিনি মাসিক নিট মুনাফা আয় করছেন কমপক্ষে দেড় লাখ টাকা। ওই ফার্মের প্রতি জোড়া কবুতরের সর্বনিম্ন মূল্য ২ হাজার টাকা। তবে সেখানে প্রতি জোড়া ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা মূল্যের বিভিন্ন ধরনের উন্নতজাতের কবুতরও রয়েছে। কবুতর চাষে কবুতরের খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও বাসস্থানের ব্যাপারে শিক্ষক বিপ্লব তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

কবুতর চাষে বিপ্লব তার অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, কবুতরের বাসস্থান তৈরি করতে হলে বাড়ির ছাদে অথবা কোনো খোলা জায়গায় তাপ নিয়ন্ত্রণ উপযোগী একটি শেড নির্মাণ করতে হবে। সেখানে ছোট কবুতরের জন্য আড়াই ফুট স্কয়ার সাইজের এবং বড় কবুতরের জন্য সাড়ে তিন ফুট স্কয়ার সাইজের লোহার খাঁচায় কবুতর পালন করতে হবে। ওই খাঁচায় নিয়মিত পানি ও খাদ্য সরবরাহ করতে হবে এবং নিয়মিত শেডের ময়লা পরিষ্কার করতে হবে।

কবুতরের খাদ্য তৈরির ক্ষেত্রে সাদা সরিষা, গম, ভুট্টা ভাঙা, কুসুম ফুলের বিচি, মসুর কলাই, খেসারি কালাই, মুগ কালাই, মাস কালাই, রেইঙ্কল, ও বুট কালাইসহ ১১টি শস্যের সমপরিমাণ মিশ্রণে সুষম খাদ্য তৈরি করেন। তবে শীতকালে শীতজনিত রোগবালাই থেকে রক্ষার্থে কবুতরের খাদ্য তৈরির ক্ষেত্রে রেইঙ্কল, বুট ও মাস কালাই মিশ্রণ বাদ রাখেন। এ সুষম খাদ্যে কবুতরের স্বাস্থ্য সর্বদায় ভালো থাকে এবং নিয়মিত ডিম দিতে ও বাচ্চা ফুটাতে সহায়ক হয় বলে জানান তিনি।

তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই তার কবুতর পোষার স্বপ্ন ছিল প্রবল। উড়ন্ত কবুতর দেখতে তার খুব ভালো লাগত। তাই তিনি শখের বশে এ খামার গড়ে তুলেন। খামারে প্রায় ১০ প্রজাতির কবুতর রয়েছে। তার খামারে বর্তমানে কবুতরের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তিনি এসব কবুতর সংগ্রহ করেছেন।

কখনও বিনিময় পদ্ধতি অর্থাৎ, এক জাতের কবুতর দিয়ে অন্য জাতের নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে তার সংগ্রহশালা বাড়িয়েছেন। তার খামারের বাসিন্দা একজোড়া কিং কবুতরের বর্তমান বাজারমূল্য ৮ হাজার টাকা। আর একজোড়া মুক্ষী কবুতরের দাম তিন হাজার টাকা। তবে কবুতরের ওড়ার ক্ষমতার ওপর এর দাম নির্ধারণ হয় বলে জানান শখের এ খামারি।

তবে তার এই খামার কোনো বাণিজ্যিক খামার নয়। এখান থেকে তিনি কোনো রোজগারের আশাও করেন না। এটা নিতান্তই তার শখের খামার। তার মতে, কেউ চাইলে বাণিজ্যিকভিত্তিতে এমন কবুতরের খামার করতে পারেন। এর মাধ্যমে মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

তিনি জানান, তার ফার্মের কবুতর খুব একটা অসুস্থ হয় না। তারপরও কবুতরের চিকিৎসায় ঠান্ডা লাগা, সর্দি, কাশি, আমাশয় ও কৃমি প্রতিরোধে মানুষের জন্য তৈরি ওষুধের ৮ ভাগের ১ ভাগ প্রয়োগে এবং অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রে হাঁস-মুরগির জন্য তৈরি ওষুধের ৪ ভাগের ১ ভাগ প্রয়োগ করে কবুতরের রোগ-বালাই প্রতিরোধে কার্যকর সুফল পেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

এছাড়াও শিক্ষক বিপ্লব কবুতরের চিকিৎসায় কালীগঞ্জ উপজেলা প্রাণীসম্পদ অফিসের সহযোগিতা নিয়ে নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে পারায় তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি শখের কবুতর পালন করতে পারছেন।

শিক্ষক বিপ্লবের কাছ থেকে কবুতর ও পরামর্শ নিয়ে শখের কবুতর পালন করছেন স্থানীয় তামজিম খান, তাসকিন খান, সজল, সোহেল। তাদের শখের কবুতর চাষিদের ঘরে ঘরে এখন শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন রংয়ের কিং, মুক্ষী, বুম্বে, গিরিবাজ, গিয়ারছলী, মুসলদ্যম, গোল্লাসহ প্রায় ১০ জাতের কবুতর।

মাঝেমধ্যে তিনি সব কবুতর খোপ থেকে বের করে উড়িয়ে দেন। ২০০ কবুতর যখন এক সঙ্গে আকাশে ওড়ে, কোনো কোনোটি ডিগবাজি দেয় তখন তিনি কবুতর পোষার স্বার্থকতা ও আনন্দ খুঁজে পান। দৃষ্টিনন্দন এ দৃশ্য দেখে তার প্রাণ ভরে যায়। প্রতিদিন ভোর সাড়ে ৫টায় উঠে তিনি কবুতর পরিচর্যায় হাত দেন, আর একটানা সকাল ৯টা অবধি চলে এ কাজ।

এ কাজে স্ত্রী সিলভীয়া হোসেন সুমি ও সাড়ে তিন বছরের একমাত্র ছেলে মো. সায়াদ হোসেন ছোয়াদ তাকে নানাভাবে সাহায্য করেন। তিনি বলেন, এ দু’জন না থাকলে একা এমন খামার সামলানো যেত না।

স্ত্রী সিলভীয়া হোসেন সুমি জানান, খামারের কবুতরদের বিপ্লব নিজ সন্তানের মতো লালন-পালন করেন। এই খামার তার ধ্যান-জ্ঞান। অবসরের পুরোটা সময় তার স্বামী এ খামার ও ছাদ বাগানে কাজে ব্যয় করেন। ছোটবেলা থেকে বিপ্লব কবুতর পালন করে আসছে। এজন্য অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের কাছে গালমন্দও শুনতে হয়েছে তাকে।

কিন্তু তার সখের কাজ কখনো বন্ধ করেনি সে। আজ তার বাড়িতে কবুতরের খামার করেছে। সেখান থেকে এখন বেশ পয়সাও রোজগার হচ্ছে। পাশাপাশি শখের সেই কবুতর পালনে পরিবারের পুষ্টি চাহিদাও মিটছে বেশ। বাড়ির সকলে এখন তার কাজে সহযোগিতা করছেন।

খামারের ঘরের পাশে থরে থরে সাজানো রয়েছে গম, ভুট্টা, ধান, গম ও ভুট্টার ছাল, সরষে, ডিমের খোসা, ইটের সুরকি, চুনসহ নানা জাতের খাবার। এছাড়া কবুতরগুলো সবুজ শাক-সবজি খেতেও ভালোবাসে। এ কারণে শিক্ষক বিপ্লব খামারের পাশে ছাদে নানা জাতের গাছপালা ও শাক-সবজির চাষ করেছেন। কবুতর ইচ্ছেমতো উড়ে এসব গাছের পাতা খায়। কবুতরের খুব বেশি রোগবালাই না হলেও স্থানীয় প্রাণিসম্পদ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে থাকেন তিনি।

মজার বিষয় তিনি কবুতর বিক্রি করেন না। মাঝে মধ্যে খুব পরিচিতজন কেউ অনুরোধ করলে তাদের তিনি বিনামূল্যে দিয়ে দেন। কবুতরের বাচ্চা বিক্রি করেন। পাশাপাশি এ শখের কবুতর পালন থেকে তিনি তার নিজ পরিবার ও স্বজনদের পুষ্টির চাহিদা মেটান। তবে তিনি স্থানীয় বেকার যুবকদের এই কবুতর পালনের মাধ্যমে বেকারত্ব গুচিয়ে উদ্যোগী হওয়ার পরামর্শ দেন।

কারণ তিনি মনে করেন কবুতর চাষ খুব লাভজনক। এতে সময় ও শ্রম দিয়ে যথাযথ পরিচর্চা করলে খুব দ্রুতই ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। চাষিদের মধ্যে বিপণনে সমন্বয়ের ব্যবস্থা করে এবং সরকারি অথবা বেসরকারি উদ্যোগে চাষিদের মাঝে পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নতজাতের কবুতর চাষে উৎসাহিত করে দেশের হাজার হাজার যুবকের বেকারত্ব দূর করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকতা ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, সাধারণত রানীক্ষেত ও বসন্ত রোগে কবুতর বেশি আক্রান্ত হয়। তবে এ রোগের টিকা আমাদের প্রাণীসম্পদ অফিসে পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে পিজন ম্যালেরিয়া রোগেও কবুর আক্রান্ত হয়। তবে এই রোগের জন্য মানুষের চিকিৎসায় যে ঔষধ ব্যবহার করা হয় তা কবুতরের ক্ষেত্রে ব্যবহার করলে ফল পাওয়া যায।

তিনি আরো বলেন, অনেক সময় দেখা যায় হাস-মুরগী বা কবুতর আক্রান্ত হলে প্রাণীসম্পদ অফিসে খামারিরা আসে। কিন্তু নিয়মানুযায়ী হাঁস-মুরগী বা কবুতরকে প্রতি ৩ থেকে ৪ মাস অন্তর অন্তর টিকা দিতে হয়। সেক্ষেত্রে আক্রান্ত হওয়ার আগেই প্রাণীসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করতে হয়।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন

শীর্ষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। দা এগ্রো নিউজ, ফিশ এক্সপার্ট লিমিটেডের দ্বারা পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। ৫১/এ/৩ পশ্চিম রাজাবাজার, পান্থাপথ, ঢাকা -১২০৫
ফোন: ০১৭১২-৭৪২২১৭
ইমেইল: info@theagronews.com, theagronewsbd@gmail.com