আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

পরিবেশ

দেশে দেশে ফুলের ভাষা

আসছে বসন্ত। আসছে ফুলের দিন। প্রাচীন যে ফুলের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, ধারণা করা হয় তার বয়স ১৩ কোটি বছর! আর পৃথিবীর বুকে আধুনিক মানুষের পদচারণ শুরু হয়েছিল মাত্র ৩ লাখ ১৫ হাজার বছর আগে। অর্থাৎ মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল ফুলের পৃথিবীতে, ফুলেল অভ্যর্থনায়। সেই থেকে আজ অবধি মানুষের ফুল নিয়ে বিস্ময় কাটেনি; আজও ফুলের প্রতি অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ অনুভব করে মানুষ। ধীরে ধীরে পৃথিবীতে মানুষের বয়স যত বেড়েছে, জীবনযাপনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফুলের ব্যবহারও তত বেড়েছে। শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, প্রেমে, বন্ধুত্বে ফুল হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আমাদের দেশে তো বটেই, প্রতিটি প্রাচীন সভ্যতার মানুষ ফুলকে দেখেছে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।

প্রাচীন গ্রিকদের পুষ্পপ্রীতি 

ফুলের রং এবং সৌন্দর্যের জন্য গ্রিসের পৌরাণিক কাহিনিতে ফুলের কথা বিশেষ স্থান পেয়েছে। কিছু কিছু ফুলের নামকরণেও সেসব কাহিনির চরিত্রকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। গ্রিক ঐতিহ্যে ফুলের গুরুত্ব কেবল যে কল্পকাহিনিতেই স্থান পেয়েছে, তা-ই নয়। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে তাদের সমাজে ফুল উপহার দেওয়ার প্রচলন ছিল এবং আজও তা গ্রিকদের সংস্কৃতির একটি জনপ্রিয় ও প্রচলিত প্রথা। প্রাচীনকালে তারা দেব-দেবীর উদ্দেশে পবিত্রতা এবং পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে ফুল উৎসর্গ করত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রিকদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা বদলে গেছে। বর্তমানে সুন্দরের বন্দনায়, অনুভূতি প্রকাশে ফুল উপহার এক বাঙ্​ময় ব্যঞ্জনায় উন্নীত হয়েছে। অপার্থিব দেব-দেবীর স্থান চলে গেছে পার্থিব দেব-দেবী, প্রিয়জন-পরিজনদের দখলে। বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে ফুল উপহার দেওয়া বর্তমান গ্রিক সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য প্রথা। 

প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় ফুল 

প্রাচীন মিসরীয়রাও তাদের বিশ্বাস এবং ঐতিহ্যে ফুলকে বিশেষ মর্যাদায় উপস্থাপন করেছিল। নীল নদের অববাহিকায় যেসব বাহারি রঙের ও সুঘ্রাণের ফুল ফুটত, সাধারণ লোকজন তাদের প্রিয়জনদের বিভিন্ন পালাপর্বে তা উপহার দিত। যুদ্ধে যাওয়ার আগে ফেরাউনরা তাদের রথগুলোকে ফুল দিয়ে সাজিয়ে নিত। যুদ্ধ থেকে বিজয়ী সেনা, সেনাপতিরা যখন ফেরত আসে, তখনো তাদের ফুল দিয়ে সাদরে বরণ করা হতো, যেমন করা হতো গ্রিক যোদ্ধাদের। 

মিসরের পৌরাণিক কাহিনি ঘাঁটলে দেখা যায় যে আনন্দ অনুষ্ঠানে প্রাচীন মিসরীয়রা পদ্ম ফুলের গান গাইত এবং এই ফুলের আরাধনার জন্য উৎসবের আয়োজন করত। পদ্ম ফুল ভোরে ফোটে এবং রাতে এই ফুলের পাপড়ি আবারও গুটিয়ে কুঁড়ির মতো হয়ে যায় বলে মিসরীয়রা এই চমৎকার ফুলটিকে পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করত। নীল পদ্মের খুব সুন্দর এবং তীব্র ঘ্রাণ রয়েছে। তাই প্রাচীন মিসরীয় শিল্পীরা নীল পদ্মে ঘেরা মৃত ব্যক্তির ছবি আঁকত, উপহার দিত। ফুল ছিল আধুনিক মিসরীয়দের মতো প্রাচীন মিসরীয় সংস্কৃতিতে অপরিহার্য বস্তু। 

অটোমান সাম্রাজ্য 

অভিব্যক্তি, অনুভূতি প্রকাশে ফুল উপহারের প্রচলন অটোমান সাম্রাজ্যে। ফুলপ্রেমীরা ফুল উপহার দিয়ে প্রিয়জনকে পৌঁছাত বিশেষ বার্তা। ফুলগ্রহীতা নির্দিষ্ট ফুল, ফুলের সংখ্যা এবং সেই ফুল সাজানোর ধরন দেখে বার্তাটি বুঝতে পারত। সে সময়টি ছিল ১৬০০ সালের দিকে। ইউরোপ, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতিতেও ফুল উপহার দেওয়ার মাধ্যমে বিশেষ বার্তা পাঠানোর রেওয়াজ ছিল। 

ভিক্টোরীয় সময়কাল 

১৮ শতকের প্রথম দিকে পত্রপত্রিকার প্রচার-প্রসার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভিদের প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে তুর্কিদের ফুলের মাধ্যমে সাংকেতিক বার্তা প্রদানের ধারণা ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে আমেরিকার উদ্ভিদপ্রেমীদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। সে সময়টা ছিল ভিক্টোরীয় যুগ। ইউরোপে এ সময় মনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা, বাসনার শিল্পসম্মত প্রকাশের উপায় হিসেবে ফুল উপহার দেওয়া হতো। এটা ছিল স্বীকৃত এবং প্রথাসিদ্ধ উপায়। আবেদন, নিবেদন যা মুখে বা লিখে প্রকাশ করলে মাধুর্য হারায়, তার জন্য ফুল উপহার দিলে রুচি, শিল্পবোধ আলাদা মাত্রায় উজ্জ্বল হয়, মর্মার্থ মর্মে পৌঁছে। ফুলের রূপ, বিন্যাসশৈলী, গড়ন, রং এবং মৌসুমের ওপর ভিত্তি করে একেকটি ফুলকে আলাদা করে সাজিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বা বার্তার প্রতীক হিসেবে ব্যবহারের প্রচলন তাদের সংস্কৃতিতে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। 

বাংলাদেশ

আমাদের সমাজে ফুলকে দেখা হয় পবিত্রতা ও শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে। পৃথিবীর অন্যান্য সংস্কৃতির মতো আমাদের দেশেও ফুল উপহার দেওয়া হয় শ্রদ্ধা, সম্মান, ভালোবাসা প্রকাশের জন্য। 

আমাদের দেশে ফুলের প্রাচুর্য থাকলেও ব্যবহারের বৈচিত্র্য তেমন নেই। ব্যক্তিগত পর্যায়ে ফুল উপহার দেওয়ার চর্চা সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন একটা দেখা যায় না। তবে বসন্তবরণ, ভালোবাসা দিবস ইত্যাদি অনুষ্ঠানের প্রসারের ফলে ফুল উপহার দেওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। 

একসময় আমাদের দেশে শুধু গোলাপ ফুল উপহার হিসেবে দেওয়া হতো। এই প্রথা সম্ভবত গড়ে উঠেছিল মোগলদের কারণে। উপহার হিসেবে গোলাপের সেই আবেদন এখনো আছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রজনীগন্ধা, গ্ল্যাডিওলাস, জারবেরা, দোলনচাঁপা। বসন্তদিনে এসব ফুল দিয়ে সাজানো ফুলের একটি তোড়া প্রিয়জনের হৃদয়ে দোলা দেবে বৈকি!

লেখক: অনুজীববিজ্ঞানী, বর্তমানে ফ্রান্সের বিচার বিভাগে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত।

পরিবেশ

সাইপ্রাসে বিশ্বসংস্কৃতির শান্তির নীড়

ভূমধ্যসাগরের দ্বীপ সাইপ্রাসে এক শিল্পী অভিনব প্রকল্প গড়ে তুলেছেন। আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আনা প্রাকৃতিক উপকরণের দৌলতে সেই জগত ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে। নির্মাণ শৈলির প্রেরণাও সেই প্রকৃতিই।

সাইপ্রাস দ্বীপে গাছপালার মাঝে যেন রঙিন এক মরুদ্যান। সঙ্গে শিল্পের সমারোহ। জায়গাটিকে যে আসলে জঞ্জালের স্তূপ হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল, তা বোঝা কঠিন। তার বদলে শিল্পী ও ইন্টিরিয়র ডিজাইনার হিসেবে আন্টস মিরিয়ান্টুস পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ দিয়ে সেখানে অভিনব এক স্থাপত্য সৃষ্টি করেছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রথমে শুধু সৃষ্টির তাড়না ও নিজের মনোরঞ্জনের জন্য এটা করেছিলাম। তারপর মানুষের চাহিদা মেনে সবার জন্য খুলে দিলাম।’

কারণ আচমকা কৌতূহলী মানুষের ভিড় বাড়তে লাগলো। এমনকি অনেকে প্রাচীর টপকে ব্যক্তিগত এই স্বপ্নের জগত দেখার চেষ্টা করছিল। তাই এখন আগে থেকে অনুরোধ করলে ‘ইউফোরিয়া আর্ট ল্যান্ড’ প্রকল্প ঘুরে দেখা সম্ভব। গোটা বিশ্ব ঘুরে আন্টস সেই কাজের প্রেরণা পেয়েছেন।

সেই উদ্যোগের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ কীভাবে নিজেদের বাসায় থাকে, তাদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল। যখনই কোথাও গেছি সঙ্গে নানা স্যুভেনির নিয়ে গেছি। এত কিছু সংগ্রহ করি বলে সব মনে নেই। জানতাম না একদিন সেগুলি ব্যবহার করব। হ্যাঁ, আমি প্রায় সবকিছুই ব্যবহার করেছি।’

এখন পর্যন্ত তিনি তিনটি ভিন্ন ভবনের সমষ্টির খসড়া তৈরি করেছেন। প্রত্যেকটির নিজস্ব চরিত্র রয়েছে। কিন্তু দেখলে মনে হবে স্পেনের বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি আন্টোনি গাউডির স্থাপত্যের স্থানীয় সংস্করণ।

আন্টস মিরিয়ান্টুস বলেন, ‘আমি তার দর্শন অনুসরণ করি। মানে আরও অরগ্যানিক আকার আনতে চাই। অর্থাৎ প্রকৃতির মাঝে অস্তিত্ব রয়েছে, এমন কিছু। সেখানে কখনো সরল রেখা বা নিখুঁত গোল আকার দেখা যায় না।’

২০১২ সালে আন্টস নির্মাণের কিছু উপকরণ উপহার হিসেবে পান। সে সময়ে রাষ্ট্র হিসেবে সাইপ্রাসের দেউলিয়া হবার উপক্রম দেখা দিয়েছিল। ফলে অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

সেরামিক টাইলসের মতো উপকরণ ফেলে দেবার বদলে কিছু কোম্পানি আন্টসকে সেগুলি উপহার হিসেবে দিয়ে দেয়। প্রকল্পের শুরুতে অনেক স্বেচ্ছাসেবীও সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন।

‘ইউফোরিয়া আর্ট ল্যান্ড’-এ এলে গোটা বিশ্বের নানা প্রান্তের চিহ্ন চোখে পড়বে।

আন্টস জানালেন, ‘আফ্রিকা, বিশেষ করে ইথিওপিয়া থেকে প্রেরণা পেয়েছি, কারণ সেখানকার মানুষ পাথর, ঝিনুকসহ প্রকৃতির নানা সূত্র থেকে রং কাজে লাগায়। যেমন এটা ইউক্যালিপটাস গাছের কাঠ। গাছটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। আমরা আশপাশের পরিবেশ কাজে লাগিয়ে থিমের সঙ্গে মানানসই উপকরণ ব্যবহারের চেষ্টা করি।

তিনি জানান, এটা আমার দাদির ছিল। সেখানে একই রকম কিছু দেখে এটাকে ম্যাচিং মনে হলো। গোটা মেঝেই প্রাকৃতিক পাথরের টুকরো ও আফ্রিকার সব মোটিফ দিয়ে তৈরি।’

সূর্য ডুবে গেলে ইউফোরিয়া আর্ট ল্যান্ডে ভিন্ন ধরনের এক জাদুময় পরিবেশ নেমে আসে।

আন্টস বলেন, ‘এই প্রকল্পের মধ্যে এই মুহূর্তে মাত্র তিনটি ছোট বাড়ি রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে আমরা বিভিন্ন সংস্কৃতির আরও বাড়ি তৈরি করতে চাই।’ ডয়েচে ভেলে

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

পরিবেশ

মুরগি দিয়ে ফাঁদ পেতে ধরা হলো মেছো বাঘ

ময়মনসিংহের গৌরীপুরে কৃষকের পাতা ফাঁদে একটি মেছো বাঘের শাবক ধরা পড়েছে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে উপজেলার মাওহা ইউনিয়নের কড়ইকান্দা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে উৎসুক জনতা মেছো বাঘটি দেখতে ভিড় করেছে।

স্থানীয়রা জানান, কড়ইকান্দা গ্রামে মাসখানেক ধরেই মেছো বাঘের শাবকটি ঘোরাফেরা করেছে। মেছো বাঘের উপদ্রবে এরই মধ্যে গ্রামের অনেকের হাঁস-মুরগিও নিখোঁজ হয়েছে। রোববার (১৮ অক্টোবর) রাতে গ্রামের কৃষক সোহেল মিয়া খাঁচার ভেতর মুরগি ঢুকিয়ে ফাঁদ তৈরি করে বাড়ির পাশে পেতে রাখেন। পরে সোমবার সকালে সেই ফাঁদে মেছো বাঘটি ধরা পড়ে।

সোহেল মিয়া বলেন, মেছো বাঘের শাবকটি এলাকায় ঘোরাফেরা করে মানুষের হাঁস-মুরগি ধরে নিয়ে যেত। তাই তাকে ধরতে ফাঁদ তৈরি করি। ধরা পড়া মেছো বাঘটির শরীরে বাঘের মতো ডোরাকাটা দাগ রয়েছে।

গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মারুফ বলেন, মেছো বাঘের শাবক ধরা পড়ার খবর পেয়েছি। প্রাণিটি উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বন কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে।

বন বিভাগের গৌরীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. লুৎফুর রহমান বলেন, মেছো বাঘের শাবকটি উদ্ধার করে বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হবে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

পরিবেশ

বিলে অবৈধ বাঁধ, চাষের অনুপযোগী ৩০০ হেক্টর জমি

মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়ার শঙ্কায় এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে তা নিশ্চিত করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অথচ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় প্রায় তিনশ হেক্টর কৃষি জমি অনাবাদি পড়ে আছে।

মূলত একটি বিলে অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষের কারণে কচুরিপানা আটকে অন্তত চার হাজার কৃষকের জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বিলের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ এবং মাছের অবাধ বিচরণেও ব্যাঘাত ঘটছে ওই বাঁধের কারণে।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, প্রতি হেক্টর জমিতে ছয় মেট্রিক টনেরও বেশি ধান উৎপাদন হয়। সেই হিসেবে বিলে বাঁধ দেয়ার কারণে চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়া জমিগুলোতে প্রায় দুই হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। যার বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ফরদাবাদ ও রূপসদী ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থানে থাকা বাড়িয়াদহ বিলটি দুই বছর আগে স্থানীয় ফরদাবাদ-রূপসদী ধীবর সমবায় সমিতির নামে তিন বছরের জন্য ইজারা দেয় জেলা প্রশাসন। সমিতির সদস্য পিছন দাসের নামে নেয়া ইজারার শর্ত লঙ্ঘন করে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালীর কাছে বিলটি সাব ইজারা দেয়া হয়।

সাব ইজারাদাররা মাছ চাষের জন্য বাঁশ ও জাল দিয়ে বাঁধ দেন বিলে। আর ওই বাঁধের কারণে কচুরিপানা আটকে কৃষকদের প্রায় তিনশ হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা কৃষি বিভাগ।

সরেজমিনে বাড়িয়াদহ বিলে গিয়ে দেখা গেছে, মাছ চাষের জন্য অবৈধভাবে বিলের কয়েক কিলোমিটার অংশজুড়ে বাঁশ ও জাল দিয়ে বাঁধ দিয়েছেন সাব ইজারাদাররা। এই বাঁধের ভেতরেই মাছ চাষ করা হচ্ছে। আর বাঁধের কারণে বিল সংলগ্ন প্রায় তিনশ হেক্টর জমিতে কচুরিপানা আটকে আছে। এতে কৃষকরা তাদের জমিতে চাষাবাদ করতে পারছেন না। বাঁধ দেয়ার আগে বিলে বিভিন্ন নৌযান চললেও এখন আর কোনো নৌযান চলাচল করতে পারছে না।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানিয়েছেন, এক কানি (৩০ শতাংশ) জমি থেকে কচুরিপানা সরাতে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু এই টাকা টাকা খরচ করে কচুরিপানা সরানোর সক্ষমতা নেই অধিকাংশ কৃষকের। জমিতে চাষাবাদ করতে না পেরে কোনো কোনো কৃষক বিলে মাছ ধরতে গেলে তাদের বাধা দেন ইজারাদাররা।

রূপসদী গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সাত্তার মিয়া জানান, বাড়িয়াদহ বিলের পাশে তার আড়াই কানি কৃষি জমি রয়েছে। প্রতি মৌসুমে এই জমি থেকে প্রায় ৫০ মণের মতো ধান গোলায় তোলেন তিনি। কিন্তু বিলে বাঁধ দেয়ার কারণে তার সব জমি এখন কচুরিপানার নিচে। আর তাই এবারের মৌসুমে ধান চাষ করতে পারেননি তিনি।

ফরদাবাদ গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মামুন মিয়া বলেন, বিলের পাশে আমার ১৫ কানি জমি আছে। আমার এই জমিতে প্রায় তিনশ মণ ধান হয়। শুধু এই বাঁধের কারণে কচুরিপানা আটকে আমাদের জমি এখন চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যদি বাঁধ না দিতো তাহলে কচুরিপানা আমাদের জমিতে থাকতো না, বিলে চলে যেতো। এখন আমাদের কৃষকদের মরার মতো অবস্থা।

ফরদাবাদ গ্রামের আরেক কৃষক আব্দুল হান্নান বলেন, মাছ চাষ করে তারা, আর ক্ষতি হয় আমাদের। তারা আমাদের এই ক্ষতি দেখে না। এই অবৈধ বাঁধের কারণে সব জমিতে কচুরিপানা ভরে গেছে। আমাদের দাবি এই বাঁধ ভেঙে দিয়ে জমিগুলো চাষের উপযোগী করে দেয়া হোক।

ফরদাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ সেলিম বলেন, সাব ইজারাদারদের দেয়া বাঁধের কারণে কৃষকের জমিতে এসে কচুরিপানা জমা হয়। আর কৃষকরা কচুরিপানা পরিষ্কারও করতে পারেন না, ধানও চাষ করতে পারেন না। গত দুই বছর ধরে এই অবস্থা চলছে। কৃষকরা বিলে মাছও ধরতেও পারেন না। এতে করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফরদাবাদ ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সকহারী কৃষি কর্মকর্তা মো. ইসমাঈল হোসেন সুজন বলেন, বিলে বাঁধ দেয়ার কারণে প্রায় তিনশ হেক্টর জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এই জমির ওপর চার হাজার কৃষক পরিবারের জীবিকা নির্ভর করে। সেজন্য দ্রুত বাঁধটি অপসারণ করে জমিগুলোকে চাষের উপযোগী করে তোলা প্রয়োজন।

ল ইজারাদার ও ফরদাবাদ-রূপসদী ধীবর সমবায় সমিতির সদস্য পিছন দাস বলেন, বিগত মৌসুমে কৃষকরা ধান চাষ করেছেন। এবার জমিতে আটকে থাকা কচুরিপানা আমরা পরিষ্কার করে দেবো।

এদিকে সাব ইজারাদারদের পেশীশক্তির কাছে নিরুপায় কৃষকরা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। দ্রুত সাব ইজারাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

এ ব্যাপারে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সারোয়ার বলেন, আমরা ইজারা নেয়া মৎস্যজীবী সমিতিকে সময় দিয়েছি। নির্দিষ্ট ওই সময়ের মধ্যে বাঁধটি অপসারণ করার পাশপাশি কৃষি জমিতে আটকে থাকা কচুরিপানা পরিষ্কার করার জন্য বলা হয়েছে। যদি নির্দিষ্ট করে দেয়া সময়ের মধ্যে বাঁধটি অপসারণ এবং কচুরিপানা পরিষ্কার না করা হয়- তাহলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

দৈনন্দিন

ধর্ষণ বাংলাদেশ ছাড়া আরও যেসব দেশে এই অপরাধের শাস্তি সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড

গত ১২ই অক্টোবর বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যোগ করার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা।

এর পরদিন এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশে সই করেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, যার ফলে সংশোধিত আইনটি কার্যকর হয়েছে।

বাংলাদেশে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ধর্ষণ, ধর্ষণ জনিত কারণে মৃত্যুর শাস্তি প্রসঙ্গে ৯(১) ধারায় এতদিন ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

তবে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে বা দল বেধে ধর্ষণের ঘটনায় নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে বা আহত হলে, সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। সেই সঙ্গে উভয় ক্ষেত্রেই ন্যূনতম এক লক্ষ টাকা করে অর্থ দণ্ডের বিধানও রয়েছে।

সেই আইনে পরিবর্তন এনে ধর্ষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলেই মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবনের বিধান রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে অর্থদণ্ডের বিধানও থাকছে।

এর ফলে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেয়া সপ্তম দেশ হলো বাংলাদেশ।

বিবিসি বাংলায় আর পড়তে পারেন:

মৃত্যুদণ্ডের আইন কি বাংলাদেশে ধর্ষণ বন্ধের সমাধান?

ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ নিয়ে আইন যা রয়েছে

এডিটার’স মেইলবক্স: ধর্ষণ নিয়ে ক্ষোভ, ক্রসফায়ার নিয়ে বিতর্ক আর রোহিঙ্গা নিয়ে প্রশ্ন

ধর্ষণ প্রতিরোধে ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে এত আলোচনা কেন?

বাংলাদেশ ছাড়া আর যেসব দেশে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড

ভারত

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে পাস করা এক নির্বাহী আদেশে ভারতে ১২ বছরের কম বয়সী মেয়ে শিশু ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়। ওই সময়ে ভারতজুড়ে চলতে থাকা ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ভারতের ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের কারণে যদি ভুক্তভোগী মারা যান অথবা এমনভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন যে তিনি কোনো ধরণের নাড়াচাড়া করতে অক্ষম, সেই ক্ষেত্রেও অপরাধীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে ধর্ষণ প্রমাণিত হলে ন্যুনতম দশ বছর শাস্তির বিধান রয়েছে ভারতের আইনে।

পাকিস্তান

পাকিস্তানের ফৌজদারি আইন অনুযায়ী ধর্ষণ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। ভারতের মত পাকিস্তানের আইনেও ধর্ষণ প্রমাণিত হলে সর্বনিম্ন ১০ বছর কারাদণ্ডের শাস্তির কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া দুই বা অধিক ব্যক্তি একই উদ্দেশ্য নিয়ে ধর্ষণের মত অপরাধ সংঘটন করলে বা সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করলে, প্রত্যেকের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে পাকিস্তানের পেনাল কোডে।

গত মাসে একটি হাইওয়েতে হওয়া এক ধর্ষণের ঘটনায় পাকিস্তানে তোলপাড় তৈরি হওয়ার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ধর্ষকদের জনসম্মুখে হত্যা কিংবা রাসায়নিক প্রয়োগ করে খোজা করার পক্ষে তার মতামত প্রকাশ করেছিলেন।

ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখার পাশাপাশি ধর্ষণের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করা হলেও তিন বছর পর্য্ত কারাদণ্ডের শাস্তির বিধান রয়েছে পাকিস্তানে।

সৌদি আরব

সৌদি আরবের শরিয়া আইনে ধর্ষণ একটি ফৌজদারী অপরাধ এবং এর শাস্তি হিসেবে দোররা মারা থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে সৌদি আরবে ১৫০টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যার মধ্যে আটটি ছিল ধর্ষণ অপরাধের জন্য।

ইরান

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ইরানে মোট ২৫০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২ জনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে ধর্ষণের দায়ে।

অ্যামনেস্টি বলছে, চীনের পর পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়ে থাকে ইরানে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইন অনুযায়ী, কোন নারীর সঙ্গে জবরদস্তিমূলক যৌনমিলনের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

তবে দেশটির আইনে অপরাধ সংঘটনেরর সময় ভুক্তভোগীর বয়স ১৪ বছরের নিচে হলেই কেবল সেটিকে জোরপূর্বক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০১৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মৃত্যদণ্ড কার্যকর করা না হলেও অন্তত ১৮ জনকে হত্যা, ধর্ষণ ও সশস্ত্র ডাকাতির অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দিয়েছে।

চীন

চীনে কোন নারীকে ধর্ষণ কিংবা ১৪ বছরের কম বয়সী কোন মেয়ের সঙ্গে যৌনমিলনের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে যদি ঘটনার শিকার মারা যান অথবা মারাত্মকভাবে আহত হন।

সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের ক্ষেত্রে, ধর্ষণের পর ভুক্তভোগী মারা গেলে বা মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলে, অথবা পাবলিক প্লেসে ধর্ষণ হলে বয়স বিবেচনা ছাড়া মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে দেশটিতে। এছাড়া, অপরাধী একাধিক ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলেও তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায়।

সাধারণ ক্ষেত্রে ধর্ষণ প্রমাণিত হলে ন্যূনতম তিন বছর থেকে ১০ বছর কারাদণ্ডের শাস্তি রয়েছে চীনের আইনে।

মৃত্যুদণ্ড বিধানের সমালোচনা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের

বাংলাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান কার্যকর করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বিবৃতি প্রকাশ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তারা মন্তব্য করেছে ‘চরম শাস্তি সহিংসতাকে অব্যাহত রাখে, তা প্রতিরোধ করে না।’

সংগঠনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক সুলতান মোহাম্মদ জাকারিয়ার বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিশোধের দিকে মনোনিবেশ না করে যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া ভুক্তভোগীর সুবিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ধর্ষণ মহামারি নির্মূলে এবং এর পুনরাবৃত্তি রোধে দীর্ঘমেয়াদে সংস্কার করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

একই সাথে অপরাধীদের শাস্তি যেন নিশ্চিত হয় এবং শাস্তি থেকে দায়মুক্তির সংস্কৃতি যেন বন্ধ হয়, সেদিকেও নজর দেয়ার তাগিদ দিয়েছে অ্যামনেস্টি।

যে কারণে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির বিরোধিতা করছে অ্যামনেস্টি

অ্যামনেস্টি’র সুলতান মোহাম্মদ জাকারিয়া বিবিসি বাংলাকে বলেন, “পৃথিবীর কোনো বিচার ব্যবস্থাই ত্রুটিমুক্ত নয়। যার ফলে বিচার ব্যবস্থার ত্রুটিতে একজন মানুষের প্রাণ নিয়ে নেয়ার পর যদি জানা যায় যে ঐ ব্যক্তি নির্দোষ, তখন আসলে কিছু করার থাকে না।”

আর বাংলাদেশে বর্তমানে ধর্ষণ এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাগুলোর সাথে শাস্তির মাত্রা বাড়ানো বা কমানোর সম্পর্ক খুব সামান্য বলে মনে করেন তারা।

“আমাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের সমস্যাটা পদ্ধতিগত। অর্থাৎ, আমাদের এখানে আইনে এবং বিচার প্রক্রিয়ায় কিছু সমস্যা আছে। আর এই বিচার প্রক্রিয়া সংশোধন করা না হলে শাস্তি বাড়িয়ে-কমিয়ে আসল পরিস্থিতির উন্নয়ন করা সম্ভব না”, বলেন মি. জাকারিয়া।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

দৈনন্দিন

অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে ভিকটিম ব্লেমিং কতটা প্রভাব ফেলে?

সম্প্রতি সময়ে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ধর্ষণের ঘটনা সামনে আসার পর এই অপরাধটি নিয়ে নানা ধরণের তর্ক-বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

একদিকে যেমন ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার দাবি উঠেছে ঠিক তেমনি অন্যদিকে আবার ধর্ষণের পেছনে ভুক্তভোগীদের ভূমিকা বা পরোক্ষ ইন্ধন থাকার মতো বিষয়গুলো নিয়েও কথা বলছেন অনেকে।

এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র তারকা অনন্ত জলিলের একটি ভিডিও। যেখানে তিনি নারীদেরকে টি-শার্টের মতো পোশাক পরা নিয়ে কটাক্ষ করেন।

তার মতে, নারীদের এ ধরণের পোশাক ধর্ষণের মতো অপরাধকে উস্কানি দেয়।

তার এই পোস্ট নিয়ে নানা ধরণের ট্রলসহ এর বিরুদ্ধেও আওয়াজ তুলেছেন অনেকে।

অনেকে বলছেন যে, পোশাক নিয়ে মন্তব্য করে মি. জলিল ধর্ষণের মতো অপরাধের শিকার ব্যক্তিদেরকেই আসলে দোষারোপ করছেন।

তিনি ভিকটিম ব্লেমিং করছেন বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে অভিযোগ তুলেছেন।

ভিকটিম ব্লেমিং কী?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিকটিম ব্লেমিং হচ্ছে এক ধরণের চর্চা। এটা সাধারণত যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি শুনতে পাওয়া যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন বলেন, “পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এবং এতো বছর ধরে চলে আসা নারী বিদ্বেষ, আমাদের সংস্কৃতিতে অনেক শক্তিশালী।”

তিনি বলেন, যখনই কোন ধর্ষণ কিংবা যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে তখন সমাজের বেশিরভাগ মানুষের নজর চলে যায় যে এটা কেন হল, কনটেক্সটা কোথায়। “প্রশ্ন আসে যে, শাড়ি কিভাবে পড়েছে, শাড়িটা কেমন ছিল, ওড়না ছিল না, এতো রাতের বেলা বের হয়েছে কেন-এগুলো সবই ভিকটিম ব্লেমিং। এর ফলে অ্যাটেনশনটা আর অপরাধীর উপর থাকে না। ভিকটিমের স্বভাব চরিত্রের উপর গিয়ে পড়ে।”

এ বিষয়ে মানবাধিকার আইনজীবী এলিনা খান বলেন, ভিকটিম ব্লেমিং দুই ধরণের হয়ে থাকে।

আরো পড়ুন:

প্রথম ক্ষেত্রে বলা হয় ধর্ষণ কিংবা যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে যে, ভিকটিম চরিত্রহীন, লম্পট, খারাপ- যার কারণে সে মিথ্যা কথা বলছে। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে সেটা মিথ্যা। সে হয়তো নিজের ইচ্ছায় গেছে। ব্ল্যাক মেইলিং করতে না পেরে অভিযোগ এনেছে।

দ্বিতীয় ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, জমি-জমা কিংবা পূর্ব শত্রুতার জেরে কোন নারীর স্বজন কিংবা স্বামী কোন কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ বা মামলা দায়ের করে ওই নারীকে জড়িয়ে। আর সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পর ওই নারীকেই দোষারোপ করা হয় যে, সে মিথ্যা বলেছে। অথচ এক্ষেত্রে সে নিজেও স্বজনদের ষড়যন্ত্রের কারণে ভিকটিম।

আইন বিভাগের শিক্ষক তাসলিমা ইয়াসমীন মনে করেন, ভিকটিম ব্লেমিংয়ের চর্চা সামাজিক অবস্থার সাথে সাথে বিচার ব্যবস্থা বা বিচার প্রক্রিয়াতেও প্রতিফলিত হয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সমাজের যে পিতৃতান্ত্রিক মন-মানসিকতা তার অংশ সমাজের সব মানুষ। আর সেই সাথে বিচার ব্যবস্থা ও এর বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা রয়েছে তারাও এটার অংশ।

অভিযোগকারীকে সন্দেহ করার এবং অপরাধীকে নিরপরাধ ভাবার যে প্রবণতা, বিচার ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে একজন ভুক্তভোগীকে তার মুখোমুখি হতে হয়।

মিজ ইয়াসমিন বলেন, সাধারণ কোন অপরাধের মামলায় একজন অভিযোগকারীকে যত না প্রমাণ দিতে হয়, ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের মামলায় তাকে আরো অনেক বেশি প্রমাণ হাজির করে তারপর অভিযোগ প্রমাণ করতে হয়।

“তখন তাকেও অপরাধীর মতোই তাকে গণ্য করা হয়।”

ভিকটিম ব্লেমিং কেন হয়?

এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানী সাদেকা হালিম বলেন, আমরা এখনো নারীদের সমাজে অধস্তন হিসেবে ভাবি।

এক ধরণের মনোভাব আছে যে, নারীরা নিজেরা নিজেদের দায়-দায়িত্ব নিয়ে চলাফেরা করবে। কী ধরণের পোশাক পড়বে, কেমন আচরণ করবে, কেমন করে চলাফেরা করবে-তার সবকিছুর দায় দায়িত্ব তাকে নিতে হবে।

তিনি বলেন, এ ধরণের বিষয়গুলোর সাথে ধর্ষণের ঘটনাকে এক করে ফেলা হয়। সেটাকেও তার দায় বলে ধরে নেয়া হয়।

অনন্ত জলিলের ভিডিওর কথা উল্লেখ করে সাদেকা হালিম বলেন, “অনন্ত জলিল যেসব মন্তব্য করেছে, সে তো ভিকটিম ব্লেমিংকে রি-ইনফোর্স করেছে তার কমেন্ট দিয়ে।”

তিনি বলেন, ধর্ষণ যেমনই হোক না কেন তার বিচার হতে হবে। এক্ষেত্রে সন্ধ্যা সাতটার সময় একজন নারী কোথায় ছিল, সেকি বন্ধুর সাথে ছিল কিনা, সে সিনেমা দেখতে গেছে কিনা-এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ এগুলো তার সাংবিধানিক অধিকার।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ড. কাবেরী গায়েন বলেন, এক সময় নারীরা ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনায় অভিযোগ দায়ের করতে চাইতো না লুকিয়ে রাখতো। যার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যেতো।

কিন্তু এখন নারীরা আওয়াজ তুলছে এবং ধর্ষণের ঘটনায় অভিযোগ করছে। যার কারণে অপরাধীর অপরাধ ভিন্ন পথে ঘুড়িয়ে দেয়ার জন্য ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করা হয়।

বলা হয় যে, তার পোশাক ভাল ছিল না, ও রাতের বেলা গিয়েছিল, ছেলে বন্ধুর সাথে ছিল ইত্যাদি নানা ধরণের পাল্টা অভিযোগ তোলা হয়।

“যাতে করে অপরাধটাকে অপরাধীর কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে ভিকটিমের দিকে দিয়ে অপরাধীকে আড়াল করা যায় বা অপরাধীর অপরাধকে লঘু করা যায়। আর এই ক্যাচালের মধ্য থেকে অপরাধী পার পেয়ে যায়,” তিনি বলেন।

তিনি মনে করেন, এই ধরণের চর্চা চলতে থাকলে, ভুক্তভোগী আরো বেশি করে শিকার হওয়ার ভয়ে অভিযোগ বা প্রতিবাদ করবে না, পাশাপাশি যে অপরাধী সে নিশ্চিন্ত মনে অপরাধ চালাতে থাকবে।

“ফলে অপরাধের যে অভয়ারণ্য সেটি মুক্ত হয়ে যাবে। আর এর ফলাফল হবে মারাত্মক।”

এটা বিচার ব্যবস্থায় কতটা প্রভাব ফেলে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক তাসলিমা ইয়াসমীন বলেন, বাংলাদেশের আইনে বলা আছে যে যদি কোন বিচারক মনে করেন যে কোন ভিকটিমের জবানবন্দীই বিচারের জন্য যথেষ্ট, তাহলে তিনি সেই জবানবন্দী অনুযায়ী রায় দিতে পারেন। এটা নিয়ে আইনে কোন বাধা নেই।

কিন্তু বাংলাদেশে এমন কোন কিছু তো হয়ই না, বরং উল্টো জবানবন্দী ছাড়াও তাকে নানা ধরণের প্রমাণাদি দিয়ে সেটা প্রমাণ করতে হয়। যার কারণে ধর্ষণ মামলার বিচারের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৩ শতাংশে।

জবানবন্দীতে যখন সন্দেহ এতো বেশি, এটা হয়ে থাকে ভিকটিম ব্লেমিংয়ের বিষয়টি থেকে। এটা শুধু সামাজিক অবস্থার উপর প্রভাব ফেলে তা নয় বরং বিচার ব্যবস্থার উপরও প্রভাব ফেলে।

তিনি বলেন, সামাজিক প্রভাবটা বিচার ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করে। এটা যখন বিচারে ঢুকে যায় তখন তার প্রভাব ন্যায়বিচার পাওয়ার উপরও থাকে। যখন জবানবন্দীর উপর সন্দেহ থাকে তখন প্রমাণাদির গুরুত্ব বাড়ে। আর তখন একটু এদিক-সেদিক হলেই অপরাধী পার পেয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

মানবাধিকার আইনজীবী এলিনা খান বলেন, এক সময় বাংলাদেশে তোলপাড় হয়েছিল যে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মিথ্যা মামলা হয়েছিল।

তিনি জানান, তখন তারা একটি জরিপ চালিয়ে দেখেছেন যে, এই অভিযোগের কারণে অনেক নারীই আসলে আইনের আশ্রয় নিতে পারছে না।

তিনি বলেন, ভিকটিম ব্লেমিংয়ের কারণে প্রথমত থানায় কর্মকর্তারা অনেক সময় ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের মামলা নিতে গড়িমসি করে।

দ্বিতীয়ত এটি যখন আদালতে গড়ায়, তখন আসামীপক্ষের আইনজীবী ভুক্তভোগীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কারণ বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, আসামীপক্ষের আইনজীবীর অবাধ স্বাধীনতা থাকে ভুক্তভোগীকে জিজ্ঞাসাবাদ করার। তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার।

যার কারণে সাক্ষীর উপর চাপ পড়ে এবং মামলাটি অনেক সময় দুর্বল হয়ে যায় বলে জানান আইনজীবী এলিনা খান।

বিচার শেষ হওয়ার পর যদি আসামী পার পেয়ে যায় প্রমাণাদির অভাবে তাহলে সব দোষ তখন ভুক্তভোগীর উপর এসে পরে এবং ওই নারী সম্পর্কে সবার খারাপ ধারণা জন্মায়। কিন্তু সে যে একই সাথে ভিকটিম এবং বিচারও পায়নি সেটি কেউ বিবেচনায় নেয় না।

সমাজবিজ্ঞানী সাদেকা হালিম মনে করেন, ভিকটিম ব্লেমিং যে কোন অপরাধের ঘটনাকে হালকা করে দেয়।

তিনি বলেন, এর কারণে কোন অপরাধের তদন্ত, তার বিচার এবং অন্য আইনি বিষয়গুলোর উপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে ভিকটিম ব্লেমিং। এমনকি তদন্তের মোড়ও অনেক সময় এর কারণে ঘুরে যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভিকটিম ব্লেমিংয়ের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হলে, বিচার ব্যবস্থার সাথে যারা জড়িত তাদের ধর্ষণের প্রতি সংবেদনশীলতা বাড়াতে হবে। প্রো-ভিকটিম অ্যাপ্রোচ বা অভিযোগকারীর প্রতি সহানুভূতিশীলতা বাড়ানো দরকার। আর এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট পদক্ষেপ নিতে পারে বলে মনে করেন তারা।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন

শীর্ষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। দা এগ্রো নিউজ, ফিশ এক্সপার্ট লিমিটেডের দ্বারা পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। ৫১/এ/৩ পশ্চিম রাজাবাজার, পান্থাপথ, ঢাকা -১২০৫
ফোন: ০১৭১২-৭৪২২১৭
ইমেইল: info@theagronews.com, theagronewsbd@gmail.com