আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

ফসল

দেশে আউশ আবাদে রেকর্ড

মহামারি করোনাভাইরাসের প্রভাবে সম্ভাব্য খাদ্য সংকট মোকাবিলা করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি ইঞ্চি জমিতে ফসল ফলাতে নিরলসভাবে কাজ করছে কৃষি মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে করোনা দুর্যোগের মাঝেও লক্ষ্যমাত্রার অধিক বোরো ফসল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। এখন আউশ ও আমন উৎপাদন বাড়ানো লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে আউশ ধান বীজ, আমন ধান বীজ, পাট বীজ, সার, সেচসহ বিভিন্ন প্রণোদনা কৃষকের মাঝে সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৬৬ হেক্টর জমিতে আউশ চাষ হচ্ছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি (১০০.৫২%)। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ লাখ ২৯ হাজার ৬০০ হেক্টর। আর গতবছরের তুলনায় ২ লাখের বেশি হেক্টর জমি বেড়েছে এবার, যাকে সারাদেশে রেকর্ড পরিমাণ আউশের আবাদ বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। বুধবার (১ জুলাই) মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

এতে বলা হয়, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১১ লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর জমিতে আউশ চাষ হয়েছিল, উৎপাদন হয়েছিল ৩০ লাখ ১২ হাজার মেট্রিক টন। এ বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৬ লাখ ৪৪ হাজার ৮শ মেট্রিক টন। ফলে আশা করা হচ্ছে, গত অর্থবছরের চেয়ে এবার আউশ উৎপাদন কয়েক লাখ টন বাড়বে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আউশ আবাদ বৃদ্ধির জন্য ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৪৩৪ জন কৃষককে কৃষি প্রণোদনার আওতায় বীজ ও সার এবং ৮২ হাজার ৪০০ জনকে বীজসহ মোট ৪ লাখ ৬৫ হাজার ৮৩৪ জন কৃষককে সরকারি সহায়তা হিসাবে কৃষি উপকরণ দেয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা করোনা দুর্যোগের মাঝেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কৃষকের পাশে থেকে আউশ আবাদে উদ্বুদ্ধ করেছেন, সহায়তা করেছেন। পাশাপাশি, যথাসময়ে বৃষ্টিপাত হওয়ায় আবহাওয়া আবাদের অনুকূলে ছিল এবং বোরো ধানের ভাল দাম পাওয়ায় কৃষকেরা ধানচাষে আগ্রহী হয়েছেন।

এছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে আমন আবাদের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫৯ লাখ হেক্টর এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৫৬ লাখ মেট্রিক টন চাল। আমন উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কম ফলনশীল জাতের আবাদ কমিয়ে আধুনিক/উফশি জাতের সম্প্রসারণ ও হাইব্রিড জাতের এলাকা বৃদ্ধির কার্যক্রম চলছে। এর সাথে মানসম্পন্ন বীজের প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ, সুষম সারের নিশ্চয়তা, পর্যাপ্ত সেচের ব্যবস্থা, সেচ খরচ হ্রাসকরণসহ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

আমন উৎপাদন বাড়াতে এবারই সরকার প্রথম বীজে ভর্তুকি প্রদান করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয় হতে বিএডিসির ১৯ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন আমন ধানের বীজ চাষি পর্যায়ে বিক্রয়ের জন্য ২০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। বিএডিসি তাদের ঘোষিত নির্ধারিত বিক্রয়মূল্যের চেয়ে কেজি প্রতি ১০ টাকা কম দামে উফশি আমন ধানের বীজ ও হাইব্রিডের ক্ষেত্রে কেজি প্রতি ৫০ টাকা কম দামে চাষি পর্যায়ে বীজ বিক্রি করেছে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করে মন্তব্য করতে লগ ইন করুন লগ ইন

Leave a Reply

ফসল

নওগাঁয় ২ লাখ হেক্টর জমিতে আমনের চাষ

নওগাঁয় এবার ২ লাখ হেক্টর জমিতে আমনের চাষ
নওগাঁয় এবার ২ লাখ হেক্টর জমিতে আমনের চাষ

চলতি মৌসুমে বাজারে ধানের দাম পেয়ে খুশি চাষিরা। বিগত বছরের তুলনায় এবার বোরো ধানের ফলন যেমন বেশি হয়েছে তেমনি বাজারে ধানের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দুইয়ে মিলে কৃষকরা আমন চাষে ঝুঁকেছেন।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং জেলায় নিম্নাঞ্চলের কিছু বন্যার্ত এলাকা ছাড়া মাঠে মাঠে আমন ধান রোপণের উৎসব শুরু হয়েছে। সময়োপযোগী ও পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় জমিতে কসরত, বীজতলা থেকে চারা উত্তোলন করে চারা রোপণে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, জেলার ১১ উপজেলায় এক লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান রোপণের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নওগাঁ সদর উপজেলায় হাইব্রিড জাতের ৯৫ হেক্টর, উফশী জাতের আট হাজার ৬৬০ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের ৯৯৫ হেক্টরসহ মোট নয় হাজার ৭৫০ হেক্টর। রানীনগরে হাইব্রিড জাতের ১০ হেক্টর, উফশী জাতের ১৭ হাজার ৮৩০ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের ২৪৫ হেক্টরসহ মোট ১৮ হাজার ৮৫ হেক্টর। আত্রাইয়ে হাইব্রিড জাতের পাঁচ হাজার হেক্টর, উফশী জাতের তিন হাজার হেক্টর ও স্থানীয় জাতের দুই হাজার ১২৫ হেক্টরসহ পাঁচ হাজার ১৩০ হেক্টর।

বদলগাছীতে হাইব্রিড জাতের ১০ হেক্টর, উফশী জাতের ১২ হাজার ২৬০ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের এক হাজার ৫০০ হেক্টরসহ মোট ১৩ হাজার ৭৭০ হেক্টর। মহাদেবপুরে হাইব্রিড জাতের ১০ হেক্টর, উফশী জাতের ১৮ হাজার ২৫ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের ১০ হাজার ৩০০ হেক্টরসহ মোট ২৮ হাজার ৩৩৫ হেক্টর। পত্নীতলায় হাইব্রিড জাতের ২০ হেক্টর, উফশী জাতের ২৫ হাজার ৪৩০ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের তিন হাজার হেক্টরসহ মোট ২৮ হাজার ৪৫০ হেক্টর।

নওগাঁয় ২ লাখ হেক্টর জমিতে আমনের চাষ
নওগাঁয় ২ লাখ হেক্টর জমিতে আমনের চাষ

এছাড়া ধামইরহাটে হাইব্রিড জাতের ৭৫ হেক্টর, উফশী জাতের ১৯ হাজার হেক্টর ও স্থানীয় জাতের ৭১৫ হেক্টরসহ মোট ১৯ হাজার ৭৯০ হেক্টর। সাপাহারে হাইব্রিড জাতের পাঁচ হেক্টর, উফশী জাতের ১০ হাজার ২০ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের দুই হাজার ৫০ হেক্টরসহ মোট ১২ হাজার ৭৫ হেক্টর। পোরশায় হাইব্রিড জাতের পাঁচ হেক্টর, উফশী জাতের ১৫ হাজার ৪২০ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের এক হাজার ২৭০ হেক্টরসহ মোট ১৬ হাজার ৬৯৫ হেক্টর।

মান্দায় হাইব্রিড জাতের ১০ হেক্টর, উফশী জাতের ১৩ হাজার ২৮৫ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের দুই হাজার ৪৬০ হেক্টর। নিয়ামতপুরে হাইব্রিড জাতের পাঁচ হেক্টর, উফশী জাতের ২৫ হাজার ২৪০ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের চার হাজার ৪২০ হেক্টরসহ মোট ২৯ হাজার ৬৬৫ হেক্টর।

মহাদেবপুর উপজেলার চকরাজা গ্রামের কৃষক নুর মুহাম্মদ বলেন, বোরো মৌসুমে আট বিঘা জমিতে আবাদ করেছিলাম। ফলন ভালো হয়েছে। দামও সন্তোষজনক পেয়েছি। এবার পাঁচ বিঘা জমিতে আমন ধান রোপণ করেছি। বাকি জমি একটু নিচু হওয়ায় ফেলে রেখেছি। এ বছর আমন চাষে আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে। বৃষ্টির পানিতে জমি চাষাবাদ করা হয়েছে।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. রবিআহ নূর আহমেদ বলেন, বাজারে ধানের ন্যায্য দাম পেয়ে খুশি চাষিরা। চলতি মৌসুমে হাইব্রিড জাতের ২৫০ হেক্টর, উন্নত ফলনশীল উফশী জাতের এক লাখ ৬৮ হাজার ১৭০ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের ২৯ হাজার ৮০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, চালের আকারে হাইব্রিড প্রতি হেক্টরে চার দশমিক পাঁচ মেট্রিক টন, উফশী প্রতি হেক্টররে তিন দশমিক ২৩ মেট্রিক টন এবং স্থানীয় প্রতি হেক্টরে এক দশমিক ৯৮ মেট্রিক টন উৎপাদিত হবে। সেই হিসেবে জেলায় হাইব্রিড জাতের চাল এক হাজার ১৩ মেট্রিক টন, উফশী জাতের চাল পাঁচ লাখ ৪৩ হাজার ১৮৯ মেট্রিক টন এবং স্থানীয় জাতের চাল ৫৭ হাজার ৫৭৮ মেট্রিক টনসহ সর্বমোট ছয় লাখ এক হাজার ৭৮০ মেট্রিক টন হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

ফসল

আমন নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক

আমন নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক
আমন নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক

এবারের বন্যায় ডুবে যাওয়া ৩৮ জেলার কৃষকরা আমন চাষ করতে পারবেন কি-না, তা নিয়ে সংশয়ের মধ্যে আছেন। আবহাওয়া অধিদফতর ও পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, আগস্টের শেষে আবারও বন্যার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই যদি হয়, তাহলে অনেক কৃষক আমনের আবাদ করতে পারবেন না।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমন ধান করতে হলে চারা রোপণের উত্তম সময় হলো শ্রাবণ মাস। দেশের উঁচু জায়গাগুলোতে আমনের চারা রোপণ প্রায় শেষ দিকে। বন্যার পানি নামতে নামতে যদি ভাদ্র মাসের অর্ধেক সময়ও চলে যায় তাহলে কোনোভাবেই আমনের আবাদ করা সম্ভব হবে না।

বগুড়া জেলার উল্লাপাড়া গ্রামের কৃষক হেলাল খাঁ জাগো নিউজকে বলেন, আমনের চারা শ্রাবণ মাসেই রোপণ করতে হয়। কিন্তু আমাদের এলাকায় যে গতিতে পানি নামছে, আবার আগস্টের শেষে ফের বন্যার কথা শুনছি, এমন হলে তো এবার আর আমন ধান চাষ করার মতো পরিস্থিতি থাকবে না।

আমন নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক
আমন নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক

এছাড়া অধিকাংশ কৃষকের আমনের বীজতলা ডুবে গেছে। এমন অনেক কৃষক আছেন, যাদের পক্ষে বীজ (আমনের চারা) কিনে আমন ধান চাষ করা সম্ভব নয়। এসব কৃষক খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে আছেন।

হেলাল খাঁ বলেন, ‘ধার-দেনা আর দোকান থেকে সার বাকি নিয়ে ছয় বিঘা জমিতে আউশ ধান করেছিলাম। চোখের সামনে বন্যার পানিতে তা ডুবে গেল। শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম। ওই ধান থাকলে এখন তা পেকে যেত। ধান কেটে আবারও আমন ধান চাষের প্রস্তুতি নিতাম। কিন্তু এখন সব শেষ। আমনের বীজতলাও ডুবে গেছে। ফলে এবার আর কোনোভাবেই আমন চাষ করা সম্ভব হবে না।’

বগুড়া জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ধুনট উপজেলার উল্লাপাড়া, চরপাড়া, ফকিরপাড়া, শৈলমারী, নলডাঙ্গা, এলাঙ্গী, গোসাইবাড়ী, ভান্ডারবাড়ী, শিমুলবাড়ী; শেরপুর উপজেলার শালপা, গজারিয়া, রোরৈতলী, বোয়ালকান্দিনহ ধুনট এবং শেরপুর উপজেলার ২০ ইউনিয়নের কয়েক হাজার বিঘা জমির ফসল পানির নিচে। এ পানি কত দিনে নেমে যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে আমনের আবাদ নিয়ে কৃষকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

আমন নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক
আমন নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক

আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, এবার ৩৮ জেলায় বন্যা হচ্ছে। বন্যায় কৃষক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উজানের ঢল এবং অতি বৃষ্টিতে গত জুন মাস থেকে সৃষ্ট বন্যায় উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এরপর উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ জেলাসহ জামালপুর, শেরপুর, ময়ময়সিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুরসহ ৩৮টি জেলা প্লাবিত হয় বন্যার পানিতে। এসব অঞ্চলের আউশ ধানসহ, পাট, সবজি, বাদাম, তিল ডুবে গেছে।

গত ২০ জুলাই কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, বন্যায় প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩৪৯ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। তিনি বলেন, বন্যায় আউশ, আমন, সবজি, পাটসহ বেশকিছু ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনেকগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

চলমান বন্যার সার্বিক ক্ষতি নিরূপণে কৃষিমন্ত্রী আজ (মঙ্গলবার) মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দ্রুত বন্যাপ্লাবিত এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে মাঠ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি ও মনিটরিংয়ের নির্দেশ দেন।

আমন নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক
আমন নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঈদুল আজহা-পরবর্তী পুনর্মিলনী সভায় অনলাইনে মন্ত্রী বলেন, চলমান বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। বন্যার পানি নেমে গেলে জরুরিভিত্তিতে কৃষি পুনর্বাসন ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কাজ করতে হবে। সেজন্য বীজ, সারসহ বিভিন্ন প্রণোদনা কার্যক্রম বেগবান, তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য ইতোমধ্যে ১৪টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটির পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের অন্য কর্মকর্তাদেরও নিয়মিত কাজের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের প্রত্যেকটি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে মাঠপর্যায়ের কাজের তদারকি করতে হবে।

উল্লেখ্য, খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে এবং চলমান বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ৩৮টি জেলার সবজি ও আমন ধান চাষের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বীজ, সারসহ বিভিন্ন প্রণোদনা কার্যক্রম বেগবান, তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের ১৪টি কমিটি কাজ শুরু করেছে। কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের নির্দেশে এসব তদারকি ও সমন্বয় কমিটি গঠিত হয়েছে। কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান কমিটির সার্বিক কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করছেন। সমন্বয়ের দায়িত্বে আছেন অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ) মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

ফসল

সোনালি আঁশের দিন

মাগুরা জেলায় এ বছর ৩২ হাজার ৫৫৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, বৃষ্টি হওয়ায় ফলন ভালো হয়েছে। এ সপ্তাহ থেকে পুরোদমে পাট কাটা শুরু হয়েছে। পাটগাছ কাটা ও পাটের সোনালি আঁশ আহরণের কিছু ছবি এখানে দেওয়া হলো।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

ফসল

যশোরের আখের ভালো দামে খুশির ঝিলিক

আখের বাম্পার ফলন
আখের বাম্পার ফলন

যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলায় এবার আখের ফলন ভালো হয়েছে। ফলন ভালো হওয়ায় খেত থেকে আগাম আখ কেটে বাজারে বিক্রি করছেন চাষিরা। এমনকি দামও ভালো। এতে খুশি আখচাষিরা।

অনুকূল আবহাওয়া এবং রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় আখের ফলন ভালো হয়েছে বলে আখচাষি ও কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

 উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় গত বছরের চেয়ে এবার আখের চাষ বেশি হয়েছে। গত বছর উপজেলায় আখের চাষ হয়েছিল ৮০ হেক্টর জমিতে। এবার চাষ হয়েছে ১১০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ গত বছরের চেয়ে এবার ৩০ হেক্টর বেশি জমিতে আখের চাষ হয়েছে। উপজেলার সব জমিতে এবার গেন্ডারি জাতের আখ চাষ হয়েছে। এবার আবহাওয়া অনুকূল থাকায় আখখেতে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম ছিল। এ ছাড়া এবার চাষিদের ভালো জাতের আখ চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা ভালো জাত নির্বাচন করেছেন। এ কারণে উপজেলায় এবার আখের ফলন খুব ভালো হয়েছে।

উপজেলার দোহাকুলা ইউনিয়নের শুকদেবনগর, ছাইবাড়িয়া, নওয়াপাড়া, খলশী, বহরামপুর ও ইন্দ্রা গ্রামে বেশি আখ চাষ হয়েছে। এ ছাড়া জামদিয়া ইউনিয়নের দাঁতপুর ও করিমপুর; দরাজহাট ইউনিয়নের দরাজহাট, হাবুল্যা, মহিরন ও লক্ষ্মীপুর এবং নারিকেলবাড়িয়া ও রায়পুর ইউনিয়নের বিভিন্ন জায়গায় আখ চাষ হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, খেত থেকে আখ কাটা, পরিষ্কার করা এবং বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। এ সময় কয়েকজন চাষি বলেন, গত বছর আখের দাম ভালো ছিল। এ জন্য তাঁরা এবার বেশি পরিমাণ জমিতে আখের চাষ করেছেন। এবার মৌসুমজুড়ে আবহাওয়া ভালো ছিল। রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণও কম ছিল। এ জন্য এবার আখের খুব ভালো ফলন হয়েছে।

 দোহাকুলা গ্রামের আখচাষি তরিকুল ইসলাম এবার ২৬ শতক জমিতে আখ চাষ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আখের চারা ক্রয় থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। খেত থেকে আখ কেটে বিক্রি শুরু করেছি। দাম ভালো পাচ্ছি। আশা করছি, এবার ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার আখ বিক্রি করতে পারব।’

বাঘারপাড়া গ্রামের কৃষক ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘এবার প্রথম আমি ১২ শতক জমিতে আখের চাষ করেছি। এতে আমার ৩০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। ফলন খুব ভালো হয়েছে। আমি এখনো আখ কাটা শুরু করিনি। এবার আখের দাম ভালো। খেত থেকে প্রতিটি আখ ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আশা করছি, ৭০ হাজার টাকার আখ বিক্রি করতে পারব।’

শুকদেবনগর গ্রামের আখচাষি ওসমান গনি বলেন, এ বছর আখের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। দামও ভালো। এবার ভালো লাভ হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছর আখের ফলন ভালো হয়েছিল। দামও ভালো ছিল। এ জন্য এবার কৃষক বেশি পরিমাণ জমিতে আখের চাষ করেছেন। এবার মৌসুমজুড়ে অনুকূল আবহাওয়া ছিল। রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে চাষিদের পরামর্শ দিয়েছি। ফলনও ভালো হয়েছে, চাষিরা এবার দামও ভালো পাচ্ছেন।’

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

ফসল

পাটেশ্বরী: বাঙালির প্রধান অর্থকরী ফসলের গল্প

ধলসুন্দর, বাও, বিদ্যাসুন্দর, কেউত্রা, পাইধা, কাইটাবাও, কাজলা ইত্যাদি নামের স্থানীয় জাতের পাট ছিল আমাদের। ছবি: প্রথম আলো
ধলসুন্দর, বাও, বিদ্যাসুন্দর, কেউত্রা, পাইধা, কাইটাবাও, কাজলা ইত্যাদি নামের স্থানীয় জাতের পাট ছিল আমাদের। ছবি: প্রথম আলো

ধলসুন্দর, বাও, বিদ্যাসুন্দর, কেউত্রা, পাইধা, কাইটাবাও, কাজলা—এগুলো আমাদের গর্বের নাম, যার গরবে বাঙালি গর্বিত ছিল বহুকাল। পাকেচক্রে সে গর্ব এখন বিগত। সোনারং পাট আনত কাঁচা টাকা। আর সে টাকায় সমৃদ্ধ হয়েছিল একটি পুরো জাতি! সে জন্যই তার নাম ছিল ‘সোনালি আঁশ’। প্রায় দুই শ বছর পৃথিবীকে একচ্ছত্রভাবে পাটের জোগান দিয়ে গেছে এই বাংলাভূমি। এখন গল্পের মতো শোনালেও সেটাই ছিল বাস্তবতা।

প্রাচীন বইপত্রে সূক্ষ্ম পট্টবস্ত্র বা পাটের শাড়ি, পাটশাকের তরকারি কিংবা বিদেশি ভ্রমণকারীদের বর্ণনায় পাটের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে শত শত বছর ধরে বৃহত্তর বাংলা অঞ্চলে পাট উৎপন্ন হতো এবং সে পাট অর্থনৈতিকভাবে বাংলা অঞ্চলকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের প্রধান ফসল ধান, পাট, গম, যব এবং নানা ধরনের ডাল। এগুলো বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত হলেও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় ফলত সবচেয়ে বেশি। কারণ, পলিবিধৌত ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা প্রাকৃতিকভাবে উর্বর অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকা এবং উজানের আসাম অংশের ব্রহ্মপুত্র, বিশেষ করে ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া জেলার ব্রহ্মপুত্র সন্নিহিত অঞ্চলগুলো বিশ্বের প্রধান পাট উৎপাদনের এলাকা। কিন্তু এই বিপুল পাট দেশীয় চাহিদা মেটালেও একটা দীর্ঘ সময় বাংলার প্রধান অর্থকরী সম্পদ হয়ে ওঠেনি। পাট বাংলার প্রধান অর্থকরী ফসল হয়ে ওঠার পেছনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক ঘটনা জড়িয়ে আছে, তার মধ্যে দুটি যুদ্ধও আছে!

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাদেশের কাঁচা পাটকে সর্বপ্রথম একটি কৃষিপণ্য হিসেবে বাজারজাত করে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোগো। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাদেশের কাঁচা পাটকে সর্বপ্রথম একটি কৃষিপণ্য হিসেবে বাজারজাত করে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোগো। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পাটের আন্তর্জাতিক বাজার
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের কাঁচা পাটকে সর্বপ্রথম একটি কৃষিপণ্য হিসেবে বাজারজাত করে। ফলে পাট আন্তর্জাতিকভাবে একটি রপ্তানিযোগ্য পণ্য হিসেবে বিশ্বের বাজারে পরিচিতি পায়। কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা জাহাজের জন্য শক্ত রশি তৈরি করার কাজে কোন ধরনের তন্তু কার্যকরি হবে, তার খোঁজ করছিলেন বেশ আগ্রহের সঙ্গে। শেষে তাঁরা এ দেশের পাটকে আবিষ্কার করলেন জাহাজের মজবুত রশি তৈরির কাঁচামাল হিসেবে। কোম্পানির লোকেরা যখন পাট দিয়ে জাহাজের রশি তৈরির কথা চিন্তা করছেন, তখনো বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালু হয়নি।

যাহোক, বেঙ্গল বোর্ড অব ট্রেডের উদ্যোগে সর্বপ্রথম ১৭৯১ সালে পাটের নমুনা পাঠানো হয় ইংল্যান্ডে। কোম্পানির বোর্ড অব ডিরেক্টরস পাঠানো পাটের নমুনা দেখে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এরই ফলে ১৭৯৩ সালে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম এক হাজার টন কাঁচা পাট ইংল্যান্ডে রপ্তানি করা হয়। এর তিন বছর পর ১৭৯৬ সালে, বাংলা থেকে ৬৫ টন কাঁচা পাট দ্বিতীয়বারের মতো রপ্তানি করা হয়েছিল ইংল্যান্ডে। একই বছর ৪০ টন পাট জার্মানিতে এবং ৬ টন পাট যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। পরবর্তী বছরগুলোতেও বাংলা থেকে পাট রপ্তানি হতে থাকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়।

সে আমলে পাট থেকে প্রস্তুত করা হতো জাহাজের রশি, পাকানো দড়ি, পাপোশ, ডোর ম্যাটস ইত্যাদি। এর কয়েক বছর পরেই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হয়ে গেল পাটকে কেন্দ্র করে। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডশায়ার জেলার অ্যাবিংডনে ১৮২০ সালে পাটের তন্তু থেকে সুতা তৈরির কৌশল উদ্ভাবন হয়। এ ঘটনার কয়েক বছর পর ১৮৩৫ সালে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি নামক শহরে বিশ্বের প্রথম পাটের কারখানায় পাটের তন্তু বা আঁশ থেকে সুতা তৈরি করে বাজারজাতকরণ শুরু হয়। প্রকৃতপক্ষে সে সময় থেকেই ইংল্যান্ডে পাটের চাহিদা ক্রমাগত বাড়তে শুরু করে।

কফি ব্যাগ তৈরি
ইংরেজদের মতো ডাচরাও বহির্বিশ্বে বাংলার পাটের চাহিদা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল। পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে ডাচদের উপনিবেশগুলোয় কফি উৎপাদন হতো। ১৮৩৮ সালে ডাচ সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, শণের পরিবর্তে কফি ব্যাগ তৈরি হবে পাট দিয়ে। এ ঘটনায় বহির্বিশ্বে পাট রপ্তানির কার্যক্রম আরও প্রসারিত হয়।

বাংলার অভ্যন্তরীণ রপ্তানিমুখী শিল্প
পূর্ববঙ্গের, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ময়মনসিংহ ও ঢাকা জেলায় পাটের সুতা থেকে বয়নশিল্পীরা উন্নত মানের কাপড়সহ পাটজাত নানা ধরনের পণ্য তৈরি করতেন। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা হতো সেসব পণ্য। স্থানীয়ভাবে পাটের আঁশ থেকে পাওয়া সুতায় তৈরি কাপড় ইউরোপের যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স; উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বার্মা, জাভা, চীন এসব দেশে রপ্তানি হতে থাকে। ১৮৫০ সালে পূর্ববঙ্গে হস্তচালিত তাঁতে উৎপন্ন সর্বমোট ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৭১৩ পিস কাপড় উল্লিখিত দেশগুলোয় রপ্তানি হয়েছিল। সে আমলে এর বাজারমূল্য ছিল ২ লাখ ১৫৯ হাজার ৭৮২ রুপি।

১৮৫৩ থেকে ১৮৫৬ সালের মধ্যে চলা ক্রিমিয়ার যুদ্ধ পাটকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল। শিল্পী ফন্স হুবোর আঁকা চিত্রকর্ম ‘দ্য সিজ অব সিভাসটোপল’ (১৯০৪)। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
১৮৫৩ থেকে ১৮৫৬ সালের মধ্যে চলা ক্রিমিয়ার যুদ্ধ পাটকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল। শিল্পী ফন্স হুবোর আঁকা চিত্রকর্ম ‘দ্য সিজ অব সিভাসটোপল’ (১৯০৪)। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

ক্রিমিয়ার যুদ্ধ, রাশিয়ার ফ্ল্যাক্স এবং আমেরিকার গৃহযুদ্ধ
১৮২০ থেকে ১৮৩৮ সালের মধ্যে স্কটল্যান্ডে পাটের সুতা আবিষ্কার হয়ে গেছে। সে সুতা দিয়ে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি শহরের টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে সীমিত পরিসরে বিভিন্ন রকম পণ্য তৈরিও শুরু হয়ে গেছে তত দিনে। তারপরও ডান্ডির টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি ছিল ফ্ল্যাক্স–নির্ভর। রাশিয়া থেকে ফ্ল্যাক্স ডান্ডির মিলগুলোয় রপ্তানি হতো।

এ সময় তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে শুরু হয় ক্রিমিয়ার যুদ্ধ (১৮৫৩-১৮৫৬)। ১৮৫৩ সালে তুরস্কের সহায়তায় এগিয়ে আসে ইংল্যান্ড। এর ফলে রাশিয়া ইংল্যান্ডে ফ্ল্যাক্স রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এ ঘটনায় পাটের ভাগ্য খুলে যায়। ফ্ল্যাক্স তন্তুর বিকল্প হিসেবে ব্রিটিশ ভারতের পাট তন্তু ব্যবহার করা শুরু হয় বিভিন্নভাবে, যে পাটের বেশির ভাগ উৎপন্ন হতো বাংলায়।

এর পাঁচ বছরের মধ্যে পৃথিবীর পশ্চিম গোলার্ধে শুরু হয় আমেরিকার গৃহযুদ্ধ (১৮৬১-১৮৬৫)। এর ফলে সরাসরি পাটের গুরুত্ব বেড়ে যায় কয়েক গুণ। ফেডারেল ও কনফেডারেট এ দুটি বাহিনী লড়ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। পরস্পর যুদ্ধরত এ দুটি দলের সৈন্যবাহিনীর জন্য ব্যাপক প্রয়োজন দেখা দিল পাটের তৈরি ব্যাগের। আগে উভয় সেনাবাহিনী তুলা থেকে তৈরি ব্যাগ দিয়ে প্রয়োজন মেটাত। তুলার ব্যাগের চেয়ে গানি ব্যাগ বা পাটের তৈরি ব্যাগ অনেক বেশি কার্যকর হওয়ার ফলে উভয় দল যুদ্ধ চলাকালীন প্রচুর পরিমাণে পাট বাংলা থেকে আমদানি শুরু করে। উনিশ শতকের এসব আন্তর্জাতিক ঘটনা বাংলার পাটকে আরও বেশি বৈশ্বিক করে তোলে।

এর প্রমাণ মেলে উনিশ শতকের ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে সত্তরের দশক পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যানে। উল্লিখিত সময়ে বাংলায় পাটের চাষ ও চাষের আওতাধীন মোট জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বেড়েছে।

বছরজমির পরিমাণ/ একররপ্তানি/মণ
১৮৩৫-১৮৪০৮,৩৫৭১২৫,৩৬২
১৮৪০-১৮৪৫১৫,৮৪২২৩৭,৬৩৯
১৮৪৫-১৮৫০১৯,৩৬৫২৯০,৪৭৭
১৮৫০-১৮৫৫৪৮,৭৭০৭৩১,৫৪৭
১৮৬০-১৮৬৫১৮২,৪১৭২,০০৩,৪১৭
পাটেশ্বরী: বাঙালির প্রধান অর্থকরী ফসলের গল্প

পরিসংখ্যান জানিয়ে দিচ্ছে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ, আমেরিকা গৃহযুদ্ধ এবং পাটের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ফ্লাক্সের চেয়ে অনেক কম হওয়ার কারণে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলায়, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা-পদ্মা অববাহিকায় পাট চাষে রীতিমতো বিপ্লব এনে দিয়েছিল। পাট চাষের ইতিহাসে এটি অভূতপূর্ব ঘটনা।

ডাচরাও বহির্বিশ্বে বাংলার পাটের চাহিদা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল। ডাচদের তৈরি একটি জাহাজের প্রতিকৃতি। এসব জাহাজ অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে পাটও পরিবহন করত। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
ডাচরাও বহির্বিশ্বে বাংলার পাটের চাহিদা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল। ডাচদের তৈরি একটি জাহাজের প্রতিকৃতি। এসব জাহাজ অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে পাটও পরিবহন করত। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

পাটকল স্থাপন এবং চটের বস্তা তৈরি
পাটের গুরুত্ব বাড়ার জন্য পৃথিবীব্যাপী পাটকল স্থাপন এবং চটের বস্তা তৈরি শুরু হওয়া একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এর ফলে রাতারাতি পাটের প্রয়োজন বিশ্ববাজারে বেড়ে যায় কয়েক গুণ। এ সময় পূর্ববঙ্গসহ সমগ্র বাংলা এবং আসামের ব্রহ্মপুত্র সন্নিহিত কয়েকটি জেলায় পাটের চাষ শুরু হয় ব্যাপকভাবে। প্রকৃতপক্ষে এ দেশে বাণিজ্যিকভাবে পাটের চাষ শুরু হয় ১৮৩৮ সাল থেকে। এরপরেই বাংলার বিভিন্ন নদীবন্দরে, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা-পদ্মা তীরবর্তী নদীবন্দরগুলো কাঁচা পাটের বড় মোকাম হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে। ইংল্যান্ড থেকে দলে দলে পাটের কারবারিরা এ দেশে আসতে শুরু করে এ সময়। এরা কাঁচা পাটের বেল বা বড় বড় গাঁইট বাঁধার জন্য মেশিন নিয়ে এসে নৌবন্দরগুলোয় স্থাপন করে।

১৮৫৪ সালে হুগলির নিকটবর্তী রিষড়া নামক স্থানে ব্রিটিশ ভারতের প্রথম পাটকল স্থাপিত হয়। জর্জ অকল্যান্ড নামক একজন সিলোন কফি বাগানের মালিকের উদ্যোগে এ পাটকলটি স্থাপিত হয়েছিল। এর নাম ছিল বেঙ্গল অকল্যান্ডস মিল। এটি উৎপাদন শুরু করে ১৮৫৫ সালে। এর কয়েক বছরের মধ্যে পৃথিবীর বহু স্থানে একের পর এক পাটকল স্থাপিত হতে থাকে। ১৮৫৭ সালে ফ্রান্সে জুট স্পিনিং মিল চালু হয়। জার্মানি, বেলজিয়াম এবং অস্ট্রেলিয়ায় যথাক্রমে ১৮৬১, ১৮৬৫ ও ১৮৭০ সালে পাটকল স্থাপন হয়। এই মিলগুলোর কাঁচামালের একমাত্র জোগান ছিল বাংলার পাট। সে সময়কার ব্রিটিশ ভারত সরকারের একটি নীতিমালা ছিল, বিনা শুল্কে পৃথিবীর যেকোনো দেশের ব্যবসায়ীরা বিনা বাধায় বাংলাদেশ থেকে পাট কিনে যেকোনো দেশে নিয়ে যেতে পারতেন। এভাবেই সমগ্র বিশ্বের পাটের চাহিদা এককভাবে বাংলার মাধ্যমেই মেটানো হতে থাকে।

ব্রিটিশ ভারতে বর্তমান বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ ছিল বৃহত্তর বাংলায় পাটের বড় মোকাম। এর পরেই ছিল ভৈরববাজার ও চাঁদপুরের অবস্থান। এই বন্দরগুলোতে ইউরোপীয়, ভারতীয় এবং দেশি পাট ব্যবসায়ীরা একাধিক জুট প্রেসিং ও বেলিং যন্ত্র স্থাপন করেন। ফলে শত শত মানুষ এসব জায়গায় বিভিন্ন ধরনের কাজ করার সুযোগ পায়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, পূর্ববঙ্গে পাট উৎপাদন হলেও ১৯৫০ সালের আগে এই অঞ্চলে কোনো পাটকল ছিল না।

প্রখ্যাত শিল্পগোষ্ঠী আদমজি ১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জে প্রথম জুটমিল স্থাপন করে। এর অল্প দিনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গীতে সব মিলিয়ে ৯টি পাটকল নির্মিত হয়। এ মিলগুলোয় তৈরি হতো চট ও চটের বস্তা। এগুলোর কাঁচামাল ছিল ব্রহ্মপুত্র-যমুনা-পদ্মা-মেঘনা ও তিস্তা অববাহিকায় উৎপাদিত পাট। এভাবে নতুন নতুন জুটমিল তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের নারায়ণগঞ্জ, খুলনা (দৌলতপুর), টঙ্গী, সিরাজগঞ্জ, যশোর ও চট্টগ্রামে গড়ে উঠতে থাকে। প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাবে গঙ্গা তীরবর্তী পশ্চিম বাংলার অনেক পাটকল এ সময় বন্ধ হয়ে যায়।

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের জন্য বিশ্ববাজারে বেড়েছিল বাংলার পাটের দাম। ‘অন্টিটামের যুদ্ধ’, ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৮৬২। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
আমেরিকার গৃহযুদ্ধের জন্য বিশ্ববাজারে বেড়েছিল বাংলার পাটের দাম। ‘অন্টিটামের যুদ্ধ’, ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৮৬২। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

পাটকলগুলো শুধু বস্তা উৎপাদনের মধ্যে তাদের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ রাখেনি। পাটের সুতা দিয়ে উন্নত মানের ম্যাট ও কার্পেটও উৎপাদন করত তারা। পাট দিয়ে শুধু যে চটের বস্তা তৈরি হতো, তা নয়। ময়মনসিংহসহ বাংলাদেশের অনেক জেলায় পাটের মণ্ড প্রস্তুত করে কাগজ তৈরি করা হতো। ময়মনসিংহের আটিয়ায় ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম পাট থেকে কাগজ তৈরির কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন এই এলাকার কয়েকজন অগ্রগামী মানুষ।

পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী ইংরেজ এবং ডাচদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ও আমেরিকার গৃহযুদ্ধ এবং ব্যাপক কারিগরি উন্নতি—এসব কারণে বাংলার পাট প্রায় পুরো পৃথিবীতে রাজত্ব করে আনুমানিক দুই শ বছর। এরপর অবশ্য ১৯৩০ সালের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পাট রপ্তানির বজারে ক্ষতি ডেকে আনে ভীষণভাবে। ১৯৪৪-৪৫ সালের সরকারি পরিসংখ্যানমতে জানা যাচ্ছে যে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে উৎপাদিত পাটের মধ্যে শুধু বৃহত্তর বাংলায় উৎপাদিত হতো শতকরা ৮১.৬ ভাগ পাট। অবশিষ্ট পাট উৎপাদন হতো বিহার, আসাম, ওডিশা, বর্তমানের উত্তর প্রদেশ, বোম্বে এসব এলাকায়।

সে সময়কার পাক-ভারত উপমহাদেশের বাইরেও বেশ কয়েকটি দেশে পাট উৎপাদিত হতো। তবে তার পরিমাণ ছিল সামান্য। এই দেশগুলো হচ্ছে তখনকার ফরমোজা বর্তমানের তাইওয়ান, নেপাল, থাইল্যান্ড, ইরান, মিসর, সুদান, তুরস্ক, পশ্চিম আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপ, প্যারাগুয়ে, ব্রাজিল ও মেক্সিকো। ১৯৪০ সালে ইন্ডিয়ান সেন্ট্রাল জুট কমিটির দেওয়া পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ব্রিটিশ ভারতে সে বছর ৪০ হাজার টন পাট উৎপাদিত হয়েছিল। এর তুলনায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের সম্মিলিত উৎপাদন ছিল মাত্র শতকরা ২.৬ ভাগ।

পাট পরিবহনের জন্য নদীপথ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার প্যানোরমায় নদীপথ, ১৮৭৮। ছবি: ন্যাশনাল মেরিটাইম মিউজিয়াম, গ্রিনউইচ, লন্ডন
পাট পরিবহনের জন্য নদীপথ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার প্যানোরমায় নদীপথ, ১৮৭৮। ছবি: ন্যাশনাল মেরিটাইম মিউজিয়াম, গ্রিনউইচ, লন্ডন

পাট এবং বাঙালি
বিশ্ববাজারে পাটের ক্রমাগত চাহিদা এবং ব্রিটিশ ভারতের সরকার কর্তৃক পাট চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করার ফলে পাট তৎকালীন বাংলায় একটি শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় দ্রুততার সঙ্গে। এ ব্যবসায় লাভবান হতে থাকেন ইউরোপীয় বণিকশ্রেণিসহ এ দেশের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। শুধু তা–ই নয়, এই ব্যবসা সামনে রেখে বাংলায় ফড়িয়া, ব্যাপারী, আড়তদার ও দালাল শ্রেণির সৃষ্টি হয়। নদীতীরবর্তী শত শত গঞ্জ, বন্দর মুখর হয়ে ওঠে পাট বাণিজ্যের সংস্পর্শে এসে। ‘শিপার’ নামক বিদেশি পাট রপ্তানিকারকদের আবির্ভাব ঘটে সে সময়ে।

পাটের ব্যবসায় শুধু ব্যবসায়ীরাই যে এককভাবে সম্পদের মালিক হয়েছিলেন, তা নয়। পাট উৎপাদন করে বাংলার নিম্ন–মধ্যবিত্ত এবং ধনী কৃষককুল যারপরনাই উপকৃত হয়েছিলেন। কৃষিপণ্য বিক্রি করে উদ্বৃত্ত অর্থ সঞ্চয় করা যায়—বাংলার কৃষকেরা এ কথা স্বপ্নেও কোনো দিন ভাবতে পারেননি। যুগ যুগ ধরে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা বাংলার লাখ লাখ কৃষক পরিবার পাট উৎপাদন করে কার্যকরভাবে সর্বপ্রথম আর্থিক সচ্ছলতার পথে নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সন্ধান পেয়েছিলেন। বিশেষ করে তৎকালীন বাংলার অনগ্রসর হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠী পাট নামক এই ‘ক্যাশ ক্রপে’র কল্যাণে নিজেরা কোমর শক্ত করে দাঁড়াতে পেরেছিল। তারা নিজেদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর উচ্চাশা পূরণ করতে সক্ষম হয় ধীরে ধীরে। উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের শুরু, এই সময়কালের মধ্যে বাংলার হাজার হাজার মুসলিম পরিবারের শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি অতিক্রম করে মূলত পাট বিক্রির টাকায়। শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া সমগ্র বাংলার বৃহৎ এই সম্প্রদায়ের মধ্যে যাঁরা ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে তাঁরাই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিভিন্ন পরিবর্তনের।

ফলে পাট বাঙালির জীবনে শুধুই একটি অর্থকরী ফসল নয়। এটি বাঙালিকে সমৃদ্ধ করেছিল অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে। আজ যখন ‘পরিবেশবান্ধব’ উপকরণের চাহিদা রয়েছে পুরো পৃথিবীতে, তখন আমরা আমাদের পরিবেশবান্ধব ফসলটির সব সম্ভাবনা গলা টিপে হত্যা করেছি। আমরা কি এতটাই আত্মঘাতী?

সূত্র:
1. Nafis Ahmed : An Economic Geography of East Pakistan : Oxford University Press, London-Page 108, 109

2. Sinha : The Economic Annals of Bengal, London 1927, P-259.

3. A.J. Warden : ‘The Linen Trade’ : Longman, Roberts and Green, London, 1864, PP. 646-653

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন

শীর্ষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। দা এগ্রো নিউজ, ফিশ এক্সপার্ট লিমিটেডের দ্বারা পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। ৫১/এ/৩ পশ্চিম রাজাবাজার, পান্থাপথ, ঢাকা -১২০৫
ফোন: ০১৭১২-৭৪২২১৭
ইমেইল: info@theagronews.com, theagronewsbd@gmail.com