আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

মৎস্য

চাহিদা বাড়ছে কুঁচিয়ার, চাষের পদ্ধতি জেনে নিন

বাংলাদেশের মানুষ কুঁচিয়া চিনলেও মাছ হিসেবে খেতে বেশির ভাগই পছন্দ করে না। তবে বিদেশে এটির অনেক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের কোথাও কোথাও এর জনপ্রিয়তা আছে। কুঁইচা, কুইচ্চা, কুঁচে, কুঁচো, কুঁচিয়া ইত্যাদি নামে বিভিন্ন এলাকায় এটি পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Monopterus cuchia।

ইল প্রজাতির, অনেকটা বাইন মাছের মতো এটি সাধারণত পুকুর, হাওর, বাঁওড়, খাল বা ধানক্ষেতের তলদেশে বাস করে। অনেক সময় মাটিতে গর্ত করেও কুঁচিয়া বসবাস করে।বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ অপছন্দ করলেও কৃষি তথ্য সার্ভিসে বলা হয়েছে, এটি শারীরিক দুর্বলতা, রক্তশূন্যতা, অ্যাজমা, ডায়াবেটিস, বাতজ্বর, পাইলসসহ অনেক রোগ সারাতে মহৌষধের মতো কাজ করে।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস (আইইউসিএন) এর ২০০০ সালের তালিকা অনুযায়ী, এই মাছটিকে বিলুপ্তপ্রায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার পরেও বিদেশেও এই মাছের যথেষ্ট চাহিদা থাকায় ব্যাপক হারে প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়।তবে গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশেও বাণিজ্যিকভাবে কুঁচিয়ার চাষাবাদ শুরু হয়েছে।

সাধারণত বাংলাদেশে প্রকৃতি থেকেই কুঁচিয়া আহরণ করা হতো। খাবার হিসাবে তেমন জনপ্রিয়তা না থাকায় কোনোরূপ চাষাবাদ ছাড়াই প্রচুর কুঁচিয়া মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু বিদেশে এই মাছের রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুঁচিয়ার চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফলে গত কয়েক বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবেই অনেকে কুঁচিয়ার চাষ করতে শুরু করেছেন। তাদের একজন দিনাজপুরের বিরামপুরের পুতুল রানী রায়।

তিনি তার বাড়ির পাশে পতিত জমিতে চৌবাচ্চা করে প্রথম ছোট আকারে কুঁচিয়ার চাষ শুরু করেন। পরে চাহিদা দেখে আকার আরো বাড়িয়েছেন।

‘প্রথমে অল্প করে শুরু করেছিলাম। তারপর দেখলাম লাভ ভালোই হচ্ছে। নিজেরাই খেতে পারছি আবার টাকাও আয় হচ্ছে। পরে আমি আরো কয়েকটি চৌবাচ্চা তৈরি করেছি।’

তিনি জানান, স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের সহযোগিতায় ২০১৮ সালে তিনি প্রথমে দুটি চৌবাচ্চা করে কুঁচিয়া চাষ শুরু করেন। সেই সঙ্গে কুঁচিয়ার খাবার হিসাবে দেওয়ার জন্য পাশেই দুটি রিং স্ল্যাবের ভেতরে কম্পোস্ট সার তৈরি করে কেঁচোর চাষাবাদও শুরু করেন।

‘কুঁচিয়া তো রাক্ষুসে ধরনের মাছ, কিন্তু থাকে একেবারে মাটির নিচের দিকে। সেখানে কিছু পাইপ দিয়ে রেখেছি, ওরা সেই পাইপের মধ্যে ঢুকে থাকে। ওদের খাবারের জন্য পুকুরে তেলাপিয়া মাছ ছেড়েছি। সেগুলোর বাচ্চা হলে কুঁচিয়া খেয়ে ফেলে। তেলাপিয়া বড় হলে আমরাও খাই। এ ছাড়া খাবার হিসাবে কেঁচো দেই’ বলছিলেন রায়।কুঁচিয়ার খাবার হিসাবে দেয়ার জন্য তিনি কেঁচোর চাষ শুরু করেছিলেন। কিন্তু এখন সেটাই তার আরেকটা আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।

‘গত ছয় মাসে কেঁচো আর কম্পোস্ট সার বিক্রি করেছি প্রায় এক লাখ টাকার। আর কুঁচিয়া তো আমরাও ধরে খাই। না হলে কুঁচিয়া বিক্রি হতো ২০/৩০ হাজার টাকার।’‘আমার স্বামী চাষাবাদ করে। কিন্তু এখন আমার ইনকাম আমার স্বামীর চেয়েও বেশি,’ হাসতে হাসতে বলছিলেন পুতুল রানী রায়।

কুঁচিয়া চাষের পদ্ধতি
সাধারণত চৌবাচ্চা বা বাড়িতে কংক্রিটের স্থাপনা বা ডিচ তৈরি করে কুঁচিয়ার চাষাবাদ করা হয়। পুতুল রানী জানান, তার বাড়িতে প্রথমে মাটিতে পাঁচ ফিট গর্ত করে নিচে ও চারপাশে মোটা পলিথিন বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। চাইলে এটা বাধাই করেও ফেলা যায়। কুঁচিয়া যাতে গর্ত খুঁড়ে চলে না যায়, তাই এই ব্যবস্থা। এ ছাড়া পানি যেন নেমে না যায়, সেটার জন্যও এটা কাজ করে।

এরপর সেই পলিথিনের ওপর মাটির স্তর তৈরি করে দেয়া হয়। এরপর কয়েকটি মোটা পাইপ ফেলে রাখা হয়। কুঁচিয়া যেহেতু অন্ধকার পছন্দ করে, তাই তারা এসব পাইপের ভেতর ঢুকে থাকতে পারে।

এরপর পানি দিয়ে চৌবাচ্চা বা ডিচ ভর্তি করে রাখা হয়। কুঁচিয়ার খাবার হিসাবে তেলাপিয়া বা মলা মাছ জাতীয় ছোট মাছ ছেড়ে দেয়া হয়। তেলাপিয়ার বাচ্চা কুঁচিয়া খেয়ে থাকে। অনেকে মুরগির উচ্ছিষ্ট দিতে পারেন, কিন্তু তাতে পানি ময়লা হয়ে যায়।প্রাকৃতিক উৎস থেকে মা কুঁচিয়া ধরে এসব চৌবাচ্চায় ছেড়ে দেয়া হয়। সাধারণত মে, জুন বা জুলাই মাসে এগুলো বাচ্চা ছাড়ে।

এসব বাচ্চা পরের বছর জুন মাস নাগাদ বিক্রির উপযোগী হয়ে যায়। অনেকে আবার প্রাকৃতিক উৎস থেকে ছোট কুঁচিয়া সংগ্রহ করে চৌবাচ্চায় লালনপালন করে বড় করে বিক্রি করেন।

কৃষকদের মধ্যে কুঁচিয়া চাষের চাহিদা বাড়ছে
বাংলাদেশ সরকার কয়েক বছর আগে কুঁচিয়া চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। এর মাধ্যমে কুঁচিয়া চাষে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে পল্লী দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা কুঁচিয়া চাষে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিতে শুরু করে।

দেশের অন্তত ৩০টি জেলায় এখন বাণিজ্যিকভাবে কুঁচিয়ার চাষ হচ্ছে। পিকেএসএফ ২১টি জেলার ৩৩টি উপজেলায় কুঁচিয়া চাষের জন্যই ঋণ দিচ্ছে। এসব প্রকল্পের আওতায় কয়েকশ কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

এরকম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিনাজপুরের গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, ২০১৭ সাল থেকে তারা ৩০০ পুকুর বা চৌবাচ্চার মতো তৈরি করে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন।

”প্রথম প্রথম অনেকে আগ্রহী হয়নি। পরে অন্যদের লাভ করতে দেখে তারা আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে এখানে যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী আছে, তারা নিজেরাও কুঁচিয়া খায়। ফলে চাষ করার কারণে একদিকে যেমন তাদের একটা পছন্দের খাবার পাচ্ছে, আবার ঘরে টাকা আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে”, বলেন তিনি। এর ফলে প্রাকৃতিক উৎস থেকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা এই মাছের আহরণও কমে যাবে বলে তিনি আশা করছেন।

তিনি জানান, ৯ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে কেউ যদি ছোট আকারেও কুঁচিয়ার চাষাবাদ করে, তাহলে বছরে অন্তত ছয় হাজার টাকা লাভ থাকবে। কুঁচিয়ার খাবার হিসাবে তেলাপিয়ার পোনা আর কেঁচো দেওয়া হয়। ফলে একদিকে তেলাপিয়াও তারা পাবে, আবার কেঁচো বা কম্পোস্ট সার বিক্রি বাড়তি লাভ আনবে।

তিনি জানান, এখন পাইকাররা সরাসরি এসব খামারে এসে কুঁচিয়া কিনে নিয়ে ঢাকায় বিক্রি করেন। ফলে কৃষকদেরও এটি চাষে আগ্রহ বাড়ছে।

দিনাজপুরের কুচিয়ার ব্যবসায়ী বাবলু মিয়া বলছেন, ”এখন বছরে দেড়শো দুইশও মণ কুঁচিয়া বিক্রি করি। কিন্তু চাহিদা আছে আরও অনেক বেশি। যদি দুই হাজার মণ কুঁচিয়াও পাওয়া যায়, তাও বিক্রি হয়ে যাবে। ঢাকার ব্যবসায়ীরা যত চায়, সবসময় তো সেই জোগানও দিতে পারি না।”

ঢাকার একজন পাইকারি বিক্রেতা ফজলু মিয়া বলছেন, ”সারাদেশ থেকেই তাদের কাছে কুঁচিয়া আসে। তবে এখনো বেশিরভাগ কুঁচিয়া প্রাকৃতিক উৎস থেকে ধরে নিয়ে আসা হয়। গুটিকয়েক জায়গা থেকে তারা চাষের কুঁচিয়া পান।”

বিদেশে আরও বেশি রপ্তানির সুযোগ রয়েছে
বাংলাদেশে কুঁচিয়া তেমন জনপ্রিয় মাছ না হলেও অনেক দেশে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাবার।

বাংলাদেশ থেকে প্রধানত চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, হংকং, কানাডা, কুয়েত, মালয়েশিয়া, কাতার, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান ও মিয়ানমারে কুঁচিয়া রপ্তানি হয়ে থাকে। এই রপ্তানি চাহিদা বেশির ভাগের জোগান আসে প্রাকৃতিক উৎস থেকে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ২০১৯-২০২০ সালে জ্যান্ত ও শুকনো মিলিয়ে মোট কুঁচিয়া রপ্তানি হয়েছে এক কোটি ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ডলারের বেশি। সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছে চীনে, এক কোটি ডলারের ওপরে।

বাংলাদেশ লাইভ অ্যান্ড চিলড ফুড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহবুবুল আলম বলেন, ‘বিশ্বে কুঁচিয়া এবং কাঁকড়ার যে চাহিদা আছে, সব তো আমরা দিতে পারছি না। জোগান পাওয়া গেলে আমরা যত রপ্তানি করি, এর চেয়েও বেশি রপ্তানি করা সম্ভব।’

তিনি জানান, করোনাভাইরাসের কারণে আপাতত চীনসহ কয়েকটি দেশে রপ্তানিতে ভাটা পড়েছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার রপ্তানি বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করে মন্তব্য করতে লগ ইন করুন লগ ইন

Leave a Reply

মৎস্য

জোড়া বাঘাইড়ে ৩১ কেজি

নাটোরের সিংড়ায় ৩১ কেজি ওজনের দুটি বাঘাইড় মাছ বিক্রির জন্য বাজারে উঠেছে। মাছ দুটি এক নজর দেখার জন্য ভিড় করে উৎসুক জনতা। বুধবার সকালে উপজেলা চত্বরে মাছ দুটি বিক্রি করতে আসেন বগুড়ার ধুনট উপজেলার মাছ ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন।

জানা যায়, মাছ দুটি যমুনা নদীতে ধরা পড়ে। পরে ইসমাইল হোসেন ক্রয় করে সিংড়ায় নিয়ে আসেন। বড় মাছ ২০ কেজি ওজনের এবং ছোট মাছ ১১ কেজি ওজনের। ছোট মাছটি ৮০০ টাকা কেজি দরে ক্রয় করেন শহরবাড়ি গ্রামের আব্দুস সোবাহান নামের এক ব্যক্তি। অপরদিকে বড় মাছটি এক হাজার টাকা কেজি দরে কয়েকজন মিলে ক্রয় করেন।

মাছ ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বলেন, দীর্ঘ প্রায় ৫৫ বছর যাবৎ মাছের ব্যবসা করে আসছি। বাঘাইরসহ বড় বড় মাছ সিংড়ায় নিয়ে আসি। মাছ দুটি বিক্রি হওয়ায় আমি খুব খুশি।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

মৎস্য

২২ দিন পর কাল থেকে আবার ইলিশ ধরা শুরু

নদী পাড়ে জেলে পাড়ায় চলছে উৎসবের আমেজ। ইতোমধ্যে জাল ও নৌকা মেরামত করে প্রস্তুতি নিয়েছেন জেলেরা। সোমবার দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে আবারও ইলিশ মাছ ধরা শুরু হবে। ৭১টিভি

[৩] দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় চাঁদপুর মাছ ঘাটেও ফিরছে কর্মচাঞ্চল্য। বিগত বছরের মতো এবছরও কর্মসূচি সফল হয়েছে দাবি মৎস্য বিভাগের। সমকাল

[৪] ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর ২২দিন চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের চরআলেকজেন্ডার পর্যন্ত চলে মা ইলিশ রক্ষা কার্যক্রম। কর্মসূচি সফল করতে স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশ ছিলো তৎপরত।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

বাংলাদেশ

তাড়াশে ড্রামের ভেলায় চড়ে মাছ চাষ

তাড়াশে প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়ে ভেলা বানিয়ে পুকুরের মাছের খাবার দেওয়ার কাজে লাগাচ্ছেন চাষিরা। ডিঙ্গি নৌকার পরিবর্তে ড্রামের ভেলার প্রচলন দিনকে দিন বেড়েছে।

সরজমিনে দেখা যায়, আরঙ্গাইল গ্রামীণ সড়কের সঙ্গের একটি পুকুরে ড্রামের ভেলায় বসে মাছের খাবার দিচ্ছেন একজন মাছচাষি। নাসির উদ্দিন নামের ঐ মাছচাষি বলেন, ডিঙ্গি নৌকার কাঠ এক থেকে দুই বছরে নষ্ট হয়ে যায়। পুকুরে মাছ চাষের জন্য ড্রামের ভেলার ব্যবহার অতি সহজ ও দীর্ঘস্থায়ী একটি মাধ্যম। এ ভেলা টিকেও বহুদিন। বর্তমানে আমার মতো অধিকাংশ মাছচাষি পুকুরে ড্রামের ভেলা ব্যবহার করে মাছ চাষ করছেন।

জানা গেছে, চারটি প্লাস্টিকের ফাঁকা ড্রামের ওপর বাঁশের মাচা দিয়ে ড্রামের ভেলা বানানো হয়। এর পর সেই ভেলা পুকুরে ভাসিয়ে লাইলন সুতা ধরে মাছের খাবার দেওয়া হয়। যেমন করে গুণ টেনে নৌকা চালানো হয়। এ প্রসঙ্গে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মসগুল আজাদ বলেন, ডিঙ্গি নৌকার তুলনায় ড্রামের ভেলার ব্যবহার মাছচাষিদের জন্য সাশ্রয়ী।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

পরিবেশ

কুমিল্লায় পদুয়ার মাছের হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম

লেখক

শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লার পদুয়ার বাজার। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাজারটির কাঁচাবাজার ও মাছবাজার অংশ প্রায় সোয়া এক কিলোমিটার দীর্ঘ। এ বাজারের প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মাছবাজার। সপ্তাহের রোব ও বৃহস্পতিবারে বসে এটি।


বাজারে গিয়ে দেখা যায়, তিন সারিতে বসেছেন মাছ ব্যবসায়ীরা। তাজা মাছ লাফাচ্ছে বিক্রেতার ঢালার ওপরে। বড় সাইজের মাছ দেখতে ও কিনতে বেশি ভিড় দেখা যায়। ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁক-ডাকে মুখর চারপাশ। কুমিল্লার শাকতলা, জাঙ্গালিয়া, কচুয়া চৌমুহনী, রাজাপাড়া, দিশাবন্দ, নোয়াগাঁও, মোস্তফাপুর, বেলতলি, কোটবাড়ি,  সুয়াগাজী, মিয়াবাজার, চৌয়ারা, কালিকাপুর, লালমাই, বাগমারা, বিজয়পুর, বিজরা, মুদাফফরগঞ্জ, পিপুলিয়া গ্রাম ও এর আশেপাশের সৌখিন ক্রেতারা মাছ কিনতে আসেন এখানে। সড়কের পাশে গাড়ি রেখে মাছ কিনেন অনেকে। বিয়ে, জন্মদিনসহ বড় অনুষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার ও জেলার অভিজাত রেস্তোরাঁগুলো পাইকারিতে মাছ সংগ্রহ করেন পদুয়ার বাজার থেকে।
ব্যবসায়ীদের সূত্র জানায়, এখানে প্রতিদিন আড়াই শ’ দোকান বসে। দৈনিক ১০০ মেট্রিক টন মাছ বিক্রি হয় পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে। টাকার অংকে যা আড়াই কোটি টাকার বেশি। সপ্তাহে দুদিন করে মাসে আট থেকে দশটি বাজার বসে পদুয়ায়। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, পাঙ্গাস, মৃগেল, গ্রাসকার্প, সিলভার কার্প, বিগহেড ও কমনকার্প মাছ। বিক্রি হওয়া মাছের ৫০ শতাংশই এগুলো। অন্যান্য মাছের মধ্যে ২০ শতাংশ ইলিশ, ১০ শতাংশ দেশি ও ২০ শতাংশ সামুদ্রিক মাছ। রুই, কাতলা, মৃগেল ও কার্প জাতীয় মাছগুলো সংগ্রহ করা হয় কুমিল্লার দাউদকান্দি, মেঘনা ও তিতাস উপজেলার প্লাবন ভূমিখ্যাত জলাশয় থেকে। ইলিশ আসে চাঁদপুর, চট্টগ্রাম ও ঢাকা থেকে। সামুদ্রিক মাছের বেশিরভাগ সংগ্রহ করা হয় চট্টগ্রাম থেকে। কিছুসংখ্যক মাছ আনা হয় কক্সবাজার থেকে।
সামুদ্রিক মাছের মধ্যে রয়েছে চাপিলা, লইট্যা, সুরমা, কোরাল, টুনা, রূপচাঁদা, বাটা, বাইলা ও চিংড়ি। সামুদ্রিক কাঁকড়াও বিক্রি হয় এখানে। দেশি মাছ আসে কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন উপজেলা থেকে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে শিং, মাগুর, কৈ, টাকি, শোল, টেংরা, পাবদা, পুঁটি, কাচকি, বোয়াল, আইড়, বাইন, গজার প্রভৃতি।

মাছ বিক্রেতাদের মধ্যে বেশিরভাগের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি ও চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, ঢাকার কারওয়ান বাজারের মৌসুমী ব্যবসায়ী, পদুয়ার বাজারের নিকটবর্তী অঞ্চল, বৃহত্তর কুমিল্লার বেশিরভাগ উপজেলার মাছ ব্যবসায়ীরা মাছ বিক্রি করতে আসেন এ বাজারে।  ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম খুব সহজ হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, সপ্তাহের দুইদিন বাজার বসে।  দ্রুত সব মাছ বিক্রি হয়ে যায়। তাছাড়া আড়তদারের কোনো ঝামেলা নেই। ব্যবসা যা-ই হয়, তাতে লোকসানের মুখে পড়ার ঝুঁকি থাকে না। ক্রেতারাও বেশ খুশি। যাতায়াত সহজ, হাতের নাগালে পাওয়া যায় সব রকমের মাছ। দাউদকান্দির সুমন বিক্রি করেন রুই-কাতলাসহ কার্প জাতীয় মাছ। তিনি জানান, দাউদকান্দির প্লাবনভূমি থেকে মাছ সংগ্রহ করি। প্রতি বাজারে দুই লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয়। দাউদকান্দির রায়পুর থেকে আসা কবির নামে এক বিক্রেতা জানান, দৈনিক গড়ে দেড় লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয় তার। চাঁদপুরের শাহরাস্তি থেকে আসা মাছ ব্যবসায়ী তসলিম মিয়া জানান, ২০ বছর ধরে চাঁদপুর থেকে ইলিশ সংগ্রহ করে এ বাজারে বিক্রি করছেন তিনি। প্রতিদিন গড়ে ৫৫-৬০ হাজার টাকার মাছ বিক্রি হয় তার। বরুড়ার সুমন জানান, দেশি শিং ও চিংড়ি মাছ বিক্রি করি। গড়ে ৪০ হাজার টাকার মাছ বিক্রি হয়। ঢাকার কারওয়ান বাজার থেকে আসা ব্যবসায়ী আরমান জানান, ঢাকায় মাছ বিক্রির পাশাপাশি সপ্তাহে দুইদিন কুমিল্লায় চলে আসি। এখানে মাছ বিক্রি করা লাভজনক, বিক্রি অনেক বেশি। আলী আকবর নামের এক ক্রেতা জানান, চৌদ্দগ্রামের মিয়া বাজার থেকে অনেক সময় মাছ কিনতে আসি। বাড়ি ২০ কিলোমিটার দূরে হলেও মহাসড়ক দিয়ে আসতে বেশি সময় লাগে না। পছন্দের সব তাজা মাছ পাওয়া যায়। ফারুক আহমেদ নামের অপর এক ক্রেতা জানান, আমাদের বাড়ি পদুয়ার বাজার এলাকাতেই। বাবা-চাচারা মাছ কিনতেন এ বাজার থেকে। আমরাও কিনছি। ঘরের কাছে এমন মাছের মেলা দেখতে বেশ লাগে।


বাজার কমিটির সভাপতি রোটারিয়ান আব্দুল মালেক ভূঁইয়া বাসসকে বলেন, ফুট ওভারব্রিজ থেকে শুরু করে বিএডিসি ভবন পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মাছবাজারটি বসত। এখন আঞ্চলিক মহাসড়কে ফোরলেনের কাজ চলায় বাজারটি কিছুটা সংকীর্ণ করা হয়েছে। মাছবাজারটি কুমিল্লার সর্ববৃহৎ। আড়তদারের কোনো ঝামেলা নেই বলে ব্যবসায়ীরা খুব স্বাচ্ছন্দ্যে মাছ বিক্রি করেন। কুমিল্লার ব্যবসায়ীরা ছাড়াও চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ঢাকার ব্যবসায়ীরা এখানে মাছ বিক্রি করেন।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

বাংলাদেশ

মাছের টিকা উদ্ভাবন করলেন সিকৃবি শিক্ষক ড. মামুন

দেশে মাছের রোগ প্রতিরোধী প্রথম টিকা উদ্ভাবন করেছেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) শিক্ষক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন। টিকাটি মাছের রোগ প্রতিরোধে ৮৪ শতাংশ কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছেন এই মৎস্যবিজ্ঞানী। টিকাটি শরীরে পুশ করে নয় খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে মাছকে খাওয়াতে হবে।

মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মামুনের উদ্ভাবিত টিকাটি মাছের ব্যাকটেরিয়াজনিত একাধিক রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া মাছের মৃত্যুহার কমিয়ে উৎপাদন বাড়াবে।

এমন আশার কথা জানিয়ে টিকার উদ্ভাবক জাগো নিউজকে বলেন, ২০১৬ সাল থেকে মাছের টিকা উদ্ভাবন নিয়ে গবেষণা করছিলেন তিনি। ২০২১ সালে এসে তিনি এর সফলতার মুখ দেখেন।

ড. মামুন জানান, এরোমোনাস হাইড্রোফিলা নামে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মাছের ক্ষত রোগ, পাখনা পচাসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। এতে প্রতি বছর প্রচুর মাছ মারা যায়। তবে এই উপমহাদেশে মাছের টিকা নিয়ে তেমন কাজ হয়নি।আব্দুল্লাহ আল মামুন তার উদ্ভাবিত এই টিকার নাম দিয়েছেন বায়োফ্লিম।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে কিছু পাঙ্গাশ মাছের শরীরে এই টিকা প্রবেশ করিয়ে ৮৪ শতাংশ সফলতা পেয়েছি। এরপর মাঠপর্যায়ে এটি প্রয়োগ করা হবে।

‘আগামী মার্চ থেকে সিলেটের বিভিন্ন পুকুরের মাছের শরীরে এই টিকা প্রয়োগ করা হবে। এর মধ্যে কয়েকটি পুকুরও নির্ধারণ করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগে সফলতা মিললেই বাণিজ্যিক উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

ড. মামুন বলেন, এই টিকা ব্যাপকভাবে উৎপাদনের সক্ষমতা আমাদের নেই। আমাদের যে সক্ষমতা আছে তাতে প্রতি মাসে ১০০ মিলিলিটার উৎপাদন করতে পারবো। এই পরিমাণ টিকা এক কেজি মাছের খাবারের সঙ্গে মেশানো যাবে।

‘এই গবেষণা কাজে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সে একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’

সিলেট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, এই অঞ্চলের বেশিরভাগ মাছই ক্ষত রোগে আক্রান্ত হয়। এ রোগকে মাছের ক্যান্সার হিসাবে দেখা হয়। প্রতি বছর অনেক মাছ ক্ষত রোগে মারা যায় বা পচে নষ্ট হয়।

তিনি বলেন, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে মাছের শরীরে টিকা প্রয়োগ করা হলেও বাংলাদেশে এখনও শুরু হয়নি। ক্ষত রোগ থেকে মাছ মুক্ত রাখতে আমরা সাধারণত জলাশয়ে চুন ও লবণ ব্যবহার করে থাকি। মাছের টিকাটি উদ্ভাবন পুরোপুরি সফল হলে মাছের উৎপাদন অনেক বাড়বে।

সিকৃবির মৎস্য অনুষদ সূত্রে জানা যায়, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, চিলিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাছের জন্য ২৮ ধরনের টিকা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যবহার হয়। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এ ধরনের টিকা উদ্ভাবন হলো। স্বাদু পানিতে চাষযোগ্য মাছে এই টিকা প্রয়োগ করা যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মতিয়ার রহমান হাওলাদার জানান, মাছের এই টিকা তৈরিতে গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই টাকায় আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। আশা করি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎপাদিত টিকা মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের আমিষের চাহিদা পূরণ করবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০ লাখ টন মাছ উৎপাদন হয়। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। তবে বিভিন্ন রোগের কারণে প্রচুর পরিমাণ মাছ মারা যায়।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন

শীর্ষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। দা এগ্রো নিউজ, ফিশ এক্সপার্ট লিমিটেডের দ্বারা পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। ৫১/এ/৩ পশ্চিম রাজাবাজার, পান্থাপথ, ঢাকা -১২০৫
ফোন: ০১৭১২-৭৪২২১৭
ইমেইল: info@theagronews.com, theagronewsbd@gmail.com