আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

ফুল

চন্দ্রমল্লিকা চাষের নিয়ম-কানুন

চন্দ্রমল্লিকা চাষের নিয়ম-কানুন
চন্দ্রমল্লিকা চাষের নিয়ম-কানুন

শীতকালীন মৌসুমী ফুলের মধ্যে চন্দ্রমল্লিকাও বেশ জনপ্রিয়। ক্রিসমাসের সময় ফোটে বলে একে ক্রিসেন্থিমামও বলা হয়। জাপান ও চীন এর আদি জন্মস্থান। এটি বিভিন্ন বর্ণ ও রঙের হয়ে থাকে। তাই একে ‘শরৎ রানি’ও বলা হয়। বাড়ির আঙিনা, বারান্দা ও ছাদে ফুলটি চাষ করা যায়।

জলবায়ু
চন্দ্রমল্লিকা তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা আবহাওয়া এবং রৌদ্রোজ্জ্বল জায়গায় ভালো জন্মে। বাংলাদেশে শীতকালই এ ফুল চাষের উপযুক্ত সময়।

মাটি
জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ সুনিষ্কাশিত দো-আঁশ ও বেলে মাটি চন্দ্রমল্লিকা চাষের জন্য উপযোগী। মাটির পিএইচ ৬.০-৭.০ হওয়া জরুরি।

চারা তৈরি
বীজ, সাকার ও শাখা কলম থেকে চন্দ্রমল্লিকার চারা তৈরি করা যায়। জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে শাখা কলম করা শুরু হয়। একবছর বয়সী সবল ডাল থেকে ৮-১০ সেন্টিমিটার লম্বা ডাল তেরছাভাবে কেটে বেডে বা বালতিতে বসিয়ে দিলে তাতে শেকড় গজায়। ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে যখন ফুল দেওয়া শেষ হয়ে যায়; তখন গাছগুলোকে মাটির উপর থেকে ১৫-২০ সেন্টিমিটার রেখে কেটে দেওয়া হয়। কিছুদিন পর ওসব কাটা জায়গার গোড়া থেকে কিছু সাকার বের হয়। এসব সাকার ৫-৭ সেন্টিমিটার লম্বা হলে মা গাছ থেকে ওদের আলাদা করে ছায়াময় বীজতলায় বা টবে লাগানো হয়। মে-জুলাই মাসে চারাকে বৃষ্টি ও কড়া রোদ থেকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

চন্দ্রমল্লিকা চাষের নিয়ম-কানুন
চন্দ্রমল্লিকা চাষের নিয়ম-কানুন

রোপণ
শেষবারের মতো নির্দিষ্ট স্থানে কিংবা টবে রোপণের আগে চারাগুলোকে স্বতন্ত্র জমিতে বা টবে পাল্টিয়ে নিয়ে তাদের ফুল উৎপাদনের উপযুক্ততা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। জমি কিংবা টবে চারা রোপণের উপযুক্ত সময় অক্টেবর-নভেম্বর। জাতভেদে ৩০x২৫ অন্তর চন্দ্রমল্লিকা রোপণ করতে হবে।

সার
চন্দ্রমল্লিকা গাছ মাটি থেকে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য উপাদন শোষণ করে থাকে। এ কারণে জৈব ও রাসায়নিক খাদ্যযুক্ত মাটিতে এ গাছ খুব ভালোভাবে সাড়া দেয়। প্রতি হেক্টরে ১০ টন পঁচা গোবর বা কম্পোস্ট, ৪০০ কেজি ইউরিয়া, ২৭৫ কেজি টিএসপি, ৩০০ কেজি মিউরেট অব পটাশ, ১৬৫ কেজি জিপসাম, ১২ কেজি বোরিক অ্যাসিড ও জিংক অক্সাইড সার প্রয়োগ করতে হবে। সাকার রোপণের ১০-১৫ দিন আগে পঁচা গোবর বা কম্পোস্ট এবং ইউরিয়া বাদে অন্যান্য সার ৭-১০ দিন আগে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। সাকার রোপণের ২৫-৩০ দিন পর ইউরিয়া সারের অর্ধেক প্রয়োগ করতে হবে এবং বাকি অর্ধেক সার সাকার রোপণের ৪৫-৫০ দিন পর গাছের গোড়ার চারপাশে একটু দূর দিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। উপরি প্রয়োগের পর সার মাটির সাথে মিশিয়ে সেচ দিতে হবে।

কুঁড়ি
চন্দ্রমল্লিকার বেড ও টব আগাছামুক্ত রাখা উচিত। চারা লাগানোর মাসখানেক পর গাছের অাগা কেটে দিতে হয়। এতে গাছ লম্বা না হয়ে ঝোপালো হয়। চারা গাছে তাড়াতাড়ি ফুল আসলে তা সঙ্গে সঙ্গে অপসারণ করতে হয়। বড় আকারের ফুল পেতে হলে ডিসবাডিং করা উচিত। অর্থাৎ মাঝের কুঁড়িটি রেখে পাশের দুটি কুঁড়ি কেটে ফেলতে হয়। আর মধ্যম আকারের ফুল পেতে চাইলে মাঝের কুঁড়িটি অপসারণ করা উচিত।

চন্দ্রমল্লিকা চাষের নিয়ম-কানুন
চন্দ্রমল্লিকা চাষের নিয়ম-কানুন

সেচ
চন্দ্রমল্লিকার চারা বিকেলে লাগিয়ে গোড়ার মাটি চেপে দিতে হয়। চারা লাগানোর পর হালকা সেচ দিতে হয়। গাছ কখনো বেশি পানি সহ্য করতে পারে না। তাই পানি এমনভাবে দিতে হবে যেন গোড়ায় বেশিক্ষণ পানি জমে না থাকে। চারা রোপণের আগে এবং পরে প্রতিদিন নিয়মিতভাবে পরিমাণমতো পানি সেচ জরুরি।

ঠেস
চন্দ্রমল্লিকার ফুল সাধারণত ডালপালার তুলনায় বড় হয়। তাই গাছের গোড়া থেকে কুঁড়ি পর্যন্ত একটা শক্ত কাঠি পুঁতে দিতে হবে। এতে ফুল নুয়ে পড়বে না। চারা লাগানোর সময় কাঠি একবারেই পুঁতে দেওয়া ভালো। এজন্য জাত বুঝে চন্দ্রমল্লিকা গাছের উচ্চতা অনুযায়ী বাঁশের কাঠি চারার গোড়া থেকে একটু দূরে পুঁতে দিতে হয়।

শোষক পোকা
এ পোকা পাতা ও ফুলের রস শোষন করে। ফলে আক্রান্ত পাতা ও ফুলে দাগ পড়ে। এমনকি ফুল এবং গাছও শুকিয়ে যায়। এ পোকা দমনের জন্য ২ মিলি ম্যালাথিয়ন ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে।

চন্দ্রমল্লিকা চাষের নিয়ম-কানুন
চন্দ্রমল্লিকা চাষের নিয়ম-কানুন

জাব পোকা
অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয় অবস্থাতেই গাছের নতুন ডগা বা ফুলের রস চুষে খায়। এটি গাছের বৃদ্ধি এবং ফলনে মারাত্মক ক্ষতি করে। নোভাক্রন (০.১% ) বা রগর (১%) প্রয়োগ করে এ পোকা দমন করা যায়।

পাউডারি মিলডিউ
এ রোগ হলে গাছের পাতা ধূসর হয়ে যায়। পাতার উপরে সাদা সাদা পাউডার দেখা যায়। টিল্ট ২৫০ইসি ০.৫ মিলি বা ২ গ্রাম থিয়োভিট প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন অন্তর স্প্রে করে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

ফুল সংগ্রহ
জাতভেদে ফলন কমবেশি হয়। গাছ প্রতি বছরে গড়ে ৩০-৪০টি ফুল পাওয়া যায়। বাইরের পাপড়িগুলো সম্পূর্ণ খুললে এবং মাঝের পাপড়িগুলো ফুটতে শুরু করলে খুব সকালে বা বিকেলে ধারালো ছুরি দিয়ে দীর্ঘ বোঁটাসহ কেটে ফুল তোলা উচিত।

ফুল

গোলাপ চাষ, টবে গোলাপ চাষ পদ্ধতি ও গোলাপের পরিচর্যা

গোলাপ মূলত শীতকালীন ফুল। গোলাপ ফুল হলো সৌন্দর্য্য ও লাবন্যের প্রতীক। তবে বর্তমানে এর চাহিদা ও সৌন্দর্য্যের কারণে সারা বছরই গোলাপ চাষ করা হচ্ছে। বর্ণ, গন্ধ ও কমনিয়তায় গোলাপকে ফুলের রানী বলা হয়ে থাকে। পৃথিবীর সব দেশেই কমবেশি সারাবছর গোলাপের চাষ হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন জেলাতে গোলাপের চাষ করা হচ্ছে। গোলাপের চাষ দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় গোলাপ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

জলবায়ু ও মাটিঃ গোলাপ প্রধানত শীত এবং নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডীয় একটি ফুল। বেশি উষ্ণ বা আর্দ্র আবহাওয়ায় গোলাপের গাছ ভালো হয় না।  ২০-৩০ ডিগ্রী সে. তাপমাত্রা, ৮৫% আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং ১০০-১২৫ সেমি গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত গোলাপ চাষের জন্য উপযোগী। ৬.০-৬.৫ pH মানযুক্ত  সুনিষ্কাশিত এবং উর্বর দোঁআশ মাটি  গোলাপ চাষের জন্য উত্তম।

গোলাপের জাতঃ পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতের গোলাপ রয়েছে। তার মধ্যে বাংলাদেশে চাষ হয় এমন কিছু জাতসমূহ হলোঃ মিরান্ডি, পাপা মেলান্ড, ডাবল ডিলাইট, তাজমহল, প্যারাডাইস, ব্লু-মুন, মন্টেজুমা, টাটা সেন্টার, সিটি অব বেলফাষ্ট ইত্যাদি।

রোপণ সময়ঃ বাংলাদেশে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত গোলাপের চারা রোপণের জন্য উপযুক্ত সময়।

গোলাপের বংশবৃদ্ধিঃ গোলাপ গাছ বীজ, কাটিং, গুটি কলম এবং চোখ কলমের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে থাকে। শুধুমাত্র প্রজনন বা ফসল উন্নয়ন কর্মসূচীর ক্ষেত্রে বীজের মাধ্যমে গোলাপের বংশবিস্তার হয়ে থাকে। তবে নতুন গাছ উৎপন্নের প্রধান পদ্ধতি হলো বাডিং বা চোখ কলম, যার মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের উৎপাদন করা হয়ে থাকে। যে জাতটির বংশবৃদ্ধি করা হয় তার চোখ অপর একটি সুবিধামতো আদিজোড় বা (rootstock) এর উপর স্থাপন করা হয়ে থাকে। আদিজোড় গাছের সজীবতা, উৎপাদনশীলতা, ফুলের গুনাবলী, ঝোপের স্থায়ীত্ব, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মাটি ও আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করে থাকে। আদিজোড়ের কাটিংসমূহ (পেন্সিল আকৃতি) গ্রীষ্মের শেষে তৈরি করা হয়ে থাকে এবং নার্সারিতে সারি করে ২৫ -৩০ সেমি দূরত্বে রোপন করা হয়। প্রায় ৬ মাস পর এইসব কাটিংসমূহ বাডিং এর জন্য উপযুক্ত আকৃতির কান্ড তৈরি করে থাকে। গোলাপের ক্ষেত্রে মূলত T-বাডিং করা হয়ে থাকে।

টবে গোলাপের চাষপদ্ধতিঃ

টবের স্থানঃ খোলামেলা ও আলো বাতাসপূর্ণ এমন স্থানে গোলাপের টব রাখতে হবে যেখানে গাছ সকালের সূর্য কিরণসহ ৬-৮ ঘন্টা রোদ পায়। বিকেলের রোদ (বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে) না লাগানোই ভালো, কেননা এতে ফুলের রং ফ্যাকাসে হয়ে যেতে পারে। লক্ষ রাখতে হবে গোলাপ গাছে যাতে চারিদিক হতেই আলো পড়ে। কেননা একদিকে আলো পেলে গাছটি কেবল আলোর দিক দিয়েই বাড়বে। এজন্য টবসহ গাছটি মাঝে মাঝে ঘুরিয়ে নিতে হবে। গ্রীষ্মের প্রখর রোদ থেকে টবের গোলাপ গাছকে রক্ষা করার জন্য পর্যায়ক্রমে রোদ ও ছায়ায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে টব রাখলে গাছ ভালো থাকবে এবং ফুলও বেশি দিন পাওয়া যাবে।

মাটি তৈরিঃ এঁটেল মাটি গোলাপ চাষের জন্য উপযোগী নয়। টবের জন্য সার মাটি এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে মাটি বেশ ফাঁপা থাকে এবং পানি জমে না থাকে। ১ ভাগ দোআঁশ মাটি, ৩ ভাগ গোবর সার বা কম্পোষ্ট, ১ ভাগ পাতা পচা সার, আধা ভাগ বালি (নদীর সাদা বালি হলে ভাল হয়) দিয়ে মিশ্রণ তৈরি করে তাতে এক মুঠো সরিষার খৈল ও এক চামচ চুন মিশিয়ে ১টি ২০ সেমি (৮ ইঞ্চি) টবে ১ মাস রেখে দিতে হবে। এই ১ মাস টবে পানি দিয়ে মাটি উল্টে পাল্টে দিতে হবে। এতে মাটির মিশ্রণ ভালো হবে। অনেকে মাটির মিশ্রণে ব্যবহৃত চা পাতা ব্যবহার করেও ভালো ফল পেয়েছেন। টবে নিচের কয়েক সেমি পরিমাণ অংশে ইট বা মাটির হাড়ি পাতিলের ভাংগা টুকরা এমনভাবে বিছিয়ে দিতে হয় যাতে টবের মাটি এগুলোর উপর থাকে। এতে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের সুবিধা হবে।

টবের আকারঃ টবের আকার নির্ভর করে যে গোলাপের চাষ করা হবে তার জাতের উপর। ছোট জাতের জন্য ২০ সেমি (৮ ইঞ্চি) টব, বড় জাতের জন্য ৩০ সেমি (১২ ইঞ্চি) বা আরো বড় টব ব্যবহার করতে হবে। তবে প্রথম বছর যে আকারের টবে গাছ বসানো হবে পরের বছর বড়- আকারের টবে গাছ স্থানান্তর করলে বড় আকারের বেশি ফুল পাওয়া যাবে।

টবে চারা বসানোর সময়ঃ বছরের যে কোন সময়ই টবে গোলাপের চারা বসানো যায়। তবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস চারা লাগানোর উত্তম সময়। এ সময় চারা লাগালে বেশি দিন ধরে ফুল পাওয়া যাবে। এছাড়াও গাছের পরিচর্যা করতে সুবিধা হবে এবং গাছে রোগ ও পোকার আক্রমণ তুলনামুলকভাবে কম হয়ে থাকে।

টবে চারা বসানোঃ চারাগাছ বা কলমচারা মাটির গোল্লাসহ পলিথিন ব্যাগে অথবা ছোট মাটির টবে কিনতে পাওয়া যায়। চারাটি যদি টবের হয়, তাহলে টব থেকে পুরো মাটিসহ চারাটি এমনভাবে নিতে হবে যাতে ভেংগে না যায় বা শিকড়ের কোন ক্ষতি না হয়। ভেজা মাটির গোল্লাসহ চারা সংগ্রহ করলে তা একটু শুকিয়ে নিতে হবে। চারা বসাবার আগেই গাছের অপ্রয়োজনীয় পুরোনো বা মরা ডাল পালা হালকা ভাবে ছেঁটে দিতে হবে। এরপর চারাটি টবের মাঝখানে সোজা করে বসিয়ে টবের ওপরে কিছু কম্পোষ্ট সার দিয়ে গাছের গোড়ারমাটি হালকা চাপ দিয়ে বসিয়ে দিতে হবে। চারা এমনভাবে বসাতে হবে যাতে কুঁড়ি বের হবার গিট/ পর্ব টি মাটির ওপরেই থাকে।

সেচঃ টবে বসানোর পর অন্তত ২-৩ বার পানি সেচ দিতে হবে। চারা অবস্থায় গাছ যাতে প্রখর রোদ বা বৃষ্টির ঝাপ্টা থেকে রক্ষা পায় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রথম অবস্থায় ৩/৪ ঘণ্টা  এবং ধীরে ধীরে বাড়াতে বাড়াতে ৬-৭ ঘণ্টা রোদ পাওয়ার ব্যবস্থা করলে গোলাপের ফলন ভালো হবে। পানি সেচের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে গাছের গোড়ায় পানি দাঁড়িয়ে না থাকে। কচি পাতা ও কুঁড়ি ছাড়ার সময় পানি বেশি প্রয়োজন হয়ে থাকে। এ সময় সকাল সন্ধ্যা সেচ দেওয়া উচিত। ঝাঁঝরি দিয়ে ডালপালাসহ সমস্ত গাছটিই পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে।

সার প্রয়োগঃ টব বসাবার ১ মাস পর থেকে ১৫-৩০ দিন অন্তর অন্তর সার দিতে হবে। শীতের ঠিক পরেই অর্থাৎ মার্চের শেষে বা এপ্রিলের প্রথম দিকে টবের উপরের ৮/১০ সেমি মাটির স্তর তুলে দিয়ে খালি জায়গায় পচা গোবর সার ও নতুন ফাঁপা মাটি দিয়ে ভরে দিতে হবে। এর পর খড় বা পাতা দিয়ে ঢেকে গ্রীষ্মের প্রখর রোদ থেকে গাছের শিকড়কে রক্ষা করতে হবে। শীতকালে গাছ ছাটার পর, প্রতি টবে ৩ মুঠা গুঁড়া গোবর সার ও ১ মুঠা স্টিমড হাড়ের গুঁড়া বা স্টেরামিল প্রয়োগ করিতে হইবে। পরবর্তীতে পুরো শীতকালে ১ মাস পর পর ১ মুঠা করে স্টিমড্ বোন মিল বা স্টেরামিল প্রয়োগ করতে হবে।

গোলাপ গাছে বেশি ফুল উৎপাদনের জন্য পাতার সার ও ফলিয়ার স্প্রের জনপ্রিয়। কয়েকটি রাসায়নিক সার মিশিয়ে এই সার প্রস্তুত করতে হয়। শীতকালে সকাল ৮টার মধ্যে ফলিয়ার স্প্রে করতে হয়। দুই প্রকারের পাতা সার গাছে ব্যবহার করা হয়, ১টি গাছের স্বাস্থ্য ও ফুল ভাল করার জন্য অপরটি ট্রেস এলিমেন্টের জোগান দেয়ার জন্য, যেমন- ইউরিয়া, ডাই-অ্যামোনিয়াম সালফেট ও ডাই-পটাশিয়াম ফসফেট প্রতিটি ১০ গ্রাম করে ১০ লিটার পানিতে গুলে স্প্রে দ্রবণ তৈরি করতে হবে। ট্রেস এলিমেন্টের জন্য ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ২০ গ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ সালফেট ১৫ গ্রাম, ফেরাস সালফেট ১০ গ্রাম, বোরাক্স ৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে প্রতি লিটার পানিতে উল্লেখিত মিশ্রণটির ২ গ্রাম করে গুলিয়ে স্প্রে করতে হবে। দুইটি পাতা সারের সাথেই কীটনাশক বা বালাইনাশক মিশিয়ে স্প্রে করা যায় কিন্তু দুটি সার এক সাথে মিশিয়ে স্প্রে করা যাবে না।

পাতার সার টবের গোলাপের জন্য অপরিহার্য এবং জমির গোলাপের জন্য উপকারী। পাতার দু’দিকেই ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে। রাসায়নিক তরল সারের পরিবর্তে গোবর ও সরিষার খৈল ৪/৫ দিন পানিতে পচিয়ে তরল করে সপ্তাহে ২ দিন করে ব্যবহার করা যাবে। গাছের নতুন ডাল-পালা বাড়াতে ও ফুলের আকার বড় করতে এ ধরনের তরল সার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তরল সারের অভাবে ছোট মাছপঁচা পানি গাছের গোড়ায় দেওয়া যাবে। দুর্বল গাছে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম করে ইউরিয়া মিশিয়ে সকাল বিকাল পাতায় স্প্রে করলে গাছ তাজা থাকে।

চুন-পানি প্রয়োগঃ প্রতি লিটার পানিতে ১ চামচ গুড়ো চুন পরিস্কার পানিতে ভালোভাবে গুলে পাতলা ন্যাকড়ায় ছেঁকে প্রতি ৩ মাস পর পর দিতে হয়। চুন-পানি দেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে অন্য কোন সার না দিয়ে শুধু পানি দিতে হবে।

গাছ ছাঁটাইঃ মৃত ও রোগআক্রান্ত ডাল অপসারনের জন্য, গাছের উপযুক্ত আকৃতি প্রদানের জন্য, প্রতিটি ডালে ফুল আসার জন্য এবং প্রয়োজনীয় রোদ্র পাওয়ার জন্য নিয়মিত গাছ ছাটাই করতে হয়। গোলাপ হলো প্রচুর শাখা বিস্তারকারী গুল্ম জাতীয় গাছ। গাছের ফুল দেওয়া শেষ হলেই গাছ ছেঁটে দিতে হবে। নিয়মিত গাছ ছাঁটাই করলে বেশি ও বড় আকারের ফুল পাওয়া যায়। বর্ষার পর অক্টোবর-নভেম্বর মাস ছাঁটাইয়ের জন্য উপযুক্ত সময়। সাধারণত ২০-২৫ সেমি (৮-১০ ইঞ্চি) বড় রেখে ডাল ছেঁটে দিতে হয়। ডাল এমনভাবে কাটতে হবে যাতে থেঁতলে বা ছিঁড়ে না যায়। এ জন্য ধারালো ছুরি ব্যবহার করতে হয়। সাদা, হলুদ, হালকা হলুদ ও দো-রঙা জাতের গোলাপ গাছ খুব হালকা ছাঁট আর লাল জাতের গোলাপ গাছে শক্ত ছাঁট দিতে হবে।

গাছ ছাঁটাইয়ের পর ডাইব্যাক রোগের আক্রমণ হতে পারে। সুতরাং গাছ ছাঁটাইয়ের আগে ও পরে কীটনাশক ও ছত্রাক নাশক দুটোই প্রয়োগ করতে হবে।

রোগ-পোকা দমনঃ শুঁয়ো পোকা বা অনিষ্টকারী অন্য যে কোন পোকা দেখা মাত্র ধরে মেরে ফেলতে হবে। লাল মাকড়সার আক্রমণ ও ডাইব্যাক রোগই বেশ মারাত্মক। গোলাপ গাছের নানা অংশ কালো হয়ে মরে যাওয়া। এ রোগটিকেই ডাইব্যাক বলে। গাছের রোগাক্রান্ত অংশটি কেটে ফেলে ডাইথেন এম-৪৫ ২ গ্রাম/ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

চারা সংগ্রহঃ চারা সংগ্রহের সময় সুস্থ ও ভালো চারা সংগ্রহ করা উচিত। চারা সংগ্রহের সময় এর গোড়ার মাটির গোল্লাটি অবিকল আছে কিনা তা ভালো করে দেখে নিতে হবে। মাটির গোল্লাসহ চারার গোড়ার শিকড় বেরিয়ে থাকা অবস্থার চারা গাছ না নেওয়াই ভালো। অভিজ্ঞ লোকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশ্বস্ত ও পরিচিত নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহ করা উত্তম।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

ফুল

গ্লাডিওলাস চাষ

মাটি ও জলবায়ুঃ

যে কোন ধরনের উর্বর মাটিতেই গ্লাডিওলাস চাষ করা যায় তবে সুনিষ্কাশিত দো-আঁশ ও বেঁলে দো-আঁশ মাটি চাষের জন্য উত্তম। মাটির পি এইচ মান ৬-৭ এর মধ্যে থাকা উচিত। মাটির ঠান্ডা আবহাওয়ায় এ ফুল ভাল জন্মে। সাধাণত ১৫-২০ ডিগ্রী সে. তাপমাত্রা এ বৃদ্ধি ও ফুল উৎপাদনের জন্য উপযোগী। গ্লাডিওলাস প্রতিদিন ৮-১০ ঘন্টা আলো পছন্দ করে। তাই রৌদ্রজ্জ্বল জায়গা এবং ঝড়ো বাতাস প্রতিরোধের ব্যবস্থা আছে এমন জায়গা এই ফুল চাষের জন্য নির্বাচন করা উচিত।

জাতঃ

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট গ্লাডিওলাস ফুলের বারি গ্লাডিওলাস-১, বারি গ্লাডিওলাস-২ ও বারি গ্লাডিওলাস-৩ জাতগুলো উদ্ভাবন করেছে। এই জাতগুলো আমাদের দেশের সব জায়গায় চাষাবাদ উপযোগী।

বংশ বিস্তারঃ

বীজ, করম ও করমেলের মাধ্যমে গ্লাডিওলাসের বংশ বিস্তার করা যায়। সাধারণভাবে চাষের জন্য করম রোপণ করা হয়। ৪-৫ সেমি ব্যাসের করম ব্যবহার করা ভাল।

জমি তৈরি ও সার প্রয়োগঃ

গ্লাডিওলাস চাষে উপযুক্ত সময় অক্টোবর-নভেম্বর। এসময় ভালভাবে চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে জমি তৈরি করতে হয়। সাধারনত গ্লাডিওলাস চাষে প্রতি বর্গমিটারে ৫-৬ কেজি পচা গোবর বা জৈব সার, ১০ গ্রাম ইউরিয়া, ৩০ গ্রাম টিএসপি এবং ৩০ গ্রাম এমওপি সার প্রয়োজন। শেষ চাষের সময় টিএসপি, এমওপি ও গোবর সার মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে।  ইউরিয়া সারের অর্ধেক রোপনের ২০-২৫ দিন পর এবং বাকি অর্ধেক পুষ্পদন্ড বের হওয়ার পর উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।

করম রোপনঃ রোপনের আগে বীজ ১২ ঘন্টা ভিজিয়ে নিলে অঙ্কুরোদগম তরান্বিত হয়। বীজকে রোগ মুক্ত করতে ডাইথেন-এম ৪৫এর মধ্যে ভিজিয়ে (১০ লি. পানিতে ৩০-৩৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে) ছায়ায় শুকিয়ে নিতে হবে। সারি থেকে সারি ২০ সেমি এবং গাছ থেকে গাছ ১৫ সেমি দূরত্ব রেখে মাটির ৫-৬ সেমি গভীরে রোপন করতে হবে।

অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যাঃ

জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজন মত সেচ দিতে হবে। প্রতি সেচের পর জমিতে জো আসলে নিড়ানি দিয়ে জমি আলগা করে দিতে হবে। ইউরিয়া সারের প্রথম উপি প্রয়োগের পর সেচ দিতে হবে এবং জমিতে জো আসলে মাটি ঝুরঝুরে করে দুই সারির মাঝখানের মাটি গাছের গোড়ায় তুলে দিতে হবে।  বাতাসে গাছ হেলে পড়ার হাত থেকে রক্ষার জন্য ছোট ছোট খুটি বা প্লাস্টিকের রশি টেনে দেওয়া প্রয়োজন। গ্লাডিওলাসে সীট ব্লাইট রোগে পাতা ও ফুল আক্রান্ত হয় এবং ফিজিরিয়াম রট জীবানুর আক্রমণে কান্ড ও গোড়া পচে যায়। উভয় রোগের জন্য ১৫ দিন অন্তর বেভিস্টিন (.২%) বা ডাইথেন এম ৪৫ রোগ নাশক স্প্রে করতে হবে। পোকার জন্য রাইসন বা পারহেকথিয়ন স্প্রে করতে হবে।

ফুল সংগ্রহঃ

সাধারণত স্পাইকের নিচ থেকে ১-২টি পাপড়ি ফুটলে ফুল সংগ্রহ করতে হয়। ফুল সংগ্রহের পরপরই বালতি ভর্তি পানিতে সোজা করে ডুবিয়ে রেখে পরে নিম্ন তাপমাত্রায় (৬-৭ডিগ্রী) সংরক্ষণ করা উত্তম।  স্পাইক কাটার সময় গাছের গোড়ায় ৪-৫টি পাতা রাখতে হবে তাহলে করম পুষ্ট হবে।

করম তোলা ও সংরক্ষণঃ

সাধারণত মার্চ-এপ্রিল মাসে করম তোলা হয়। ফুল ফোঁটা শেষ হলে পাতা হলুদ হয় ওে গাছ মারা যায়। এসময় গাছের গোড়া খুঁড়ে সাবধানে করমগুলি সংগ্রহ করা হয়। খেয়াল রাখতে হবে যেন করম কেটে বা আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। করম সংগ্রহের পর বড় ও ছোট করম বাছাই করে ছায়ায় শুকাতে হবে। সংরক্ষণের আগে করমগুলোকে ০.১% বেনলেট বা ০.২% ক্যাপটান দ্রবণে ৩০ মিনিট শোধন করে শুকিয়ে নিতে হবে। এরপর করমগুলো ছিদ্রযুক্ত পলিথিন ব্যাগে ভরে ঘরের শকনো ও ঠান্ডা জায়গায় সংরক্ষণ করতে হবে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

ফুল

যশোরের গদখালীতে ফেরি করে ফুল বিক্রি

ফুলের রাজধানীখ্যাত যশোরের গদখালী গ্রামের ফুলচাষী সুমন বিশ্বাস। দুই বিঘা জমিতে গোলাপ আর দুই বিঘা জমিতে জারবেরা চাষ করেছিলেন। প্রতি মাসে গড়ে ৭০ লাখ টাকার ফুল বিক্রি করতেন তিনি। গত বছর করোনার প্রকোপের সময় মোটেও ফুল বিক্রি করতে পারেননি তিনি। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে তার জারবেরা ক্ষেতের পলিশেড উড়ে যায়। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে শেডটি মেরামত করেন। গত বছর আগস্ট থেকে ঘুরে দাঁড়ায় ফুলের বাজার। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন সুমন। তার সেই স্বপ্ন আবার ভেঙে গেল করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে।

ফুল বিক্রিতে বিপর্যয় চলছে। করোনা ও লাগাতার লকডাউন-বিধিনিষেধে ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে জমিতে ফোটা ফুল। স্থানীয় বাজারে ফুল বেচাকেনা ও চাহিদা না থাকায় বাধ্য হয়ে গ্রাম থেকে ৩৫ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে যশোর শহরে পানির দরে ফেরি করে ফুল বিক্রি করছেন তিনি। শুধু সুমন বিশ্বাস নন; গদখালী এলাকার প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ফুলচাষী জমি থেকে ফুল কেটে শহর কিংবা গ্রামে সাইকেল বা ভ্যানে ফেরি করে ফুল বিক্রি করছেন। আবার অনেকেই সেটা করতে না পারায় ক্ষেতের ফুল কেটে গরু-ছাগলের খাদ্য হিসেবে জোগান দিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সূত্রমতে, যশোরের ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলার ৭৫টি গ্রামের প্রায় সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমিতে চাষ করা হয় হরেক রকমের ফুল। ঝিকরগাছার পানিসারা-গদখালী গ্রামগুলোর রাস্তার দুই পাশে দিগন্ত বিস্তৃত জমিতে সারা বছরই থাকে ফুলের সমাহার। শত শত হেক্টর জমিতে গাঁদা, গোলাপ, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, জারবেরা, কসমস, ডেইজ জিপসি, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের চাষ হয় এখানে। এলাকায় উৎপাদিত ফুল বিক্রির জন্য গদখালীতে যশোর রোডের দুই ধারে রয়েছে ফুলের বাজার। প্রতিদিন উপজেলার গদখালী-পানিসারার শত শত ফুলচাষীর আনাগোনা শুরু হয় গদখালী বাজারে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছোট-বড় পাইকাররাও সেখান থেকে ফুল কিনে নিয়ে যান। এরপর বিভিন্ন হাতবদল হয়ে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে ফুল ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে, এমনকি দেশের বাইরেও। তবে করোনার কারণে এ কার্যক্রমে ছেদ পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রতি বছর ৩০০ কোটি টাকার ফুল উৎপাদন হয় এসব মাঠে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে প্রায় ২০ হাজার ফুলচাষী রয়েছেন। এর মধ্যে শুধু যশোর জেলায় প্রায় ছয় হাজার চাষী চাহিদার সিংহভাগ সরবরাহ করেন। এজন্য যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলের কৃষকের প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে ফুলই স্বীকৃত। সেই ফুলের রাজধানীতে চাষীরা ভালো নেই। মহামারী ও ঘূর্ণিঝড়ের ধকলে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। এরপর গত ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দেশের করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় সামাজিক অনুষ্ঠান ঘিরে ফুলের চাহিদা বাড়ে। বেচাকেনাও মোটামুটি ভালো হয়। তখন চাষীরা ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু মার্চে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করে। এপ্রিল থেকে কয়েক দফায় লকডাউন-বিধিনিষেধ দেয়ায় ফুলের বাজারে ধস নামে।

শমজেদ নামে এক ফুলচাষী বলেন, এখন ফুলের বাজার নেই। করোনার আগে প্রতিটি ফুল যে দামে বিক্রি করতাম, সেই দাম পেতে এখন ১০০টি ফুল বিক্রি করতে হচ্ছে। বর্তমানে ১০০ গোলাপ ১০ টাকা, অথচ করোনার আগে প্রতিটি ফুল বিক্রি করেছি দেড় থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত। এখন ১০০ গ্লাডিওলাস ২০ টাকা, করোনার আগে প্রতিটি ফুলের দাম ছিল ২০ টাকা। ১০০ ভুট্টাফুল ২০ টাকা, যা করোনার আগে বিক্রি করেছি ১০০-১৫০ টাকায়। ফুল বেচাকেনা না থাকায় ভ্যানে করে বিক্রি করে বেড়াচ্ছি।

যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় ৬২৫ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে দেশী-বিদেশী নানা জাতের ফুল চাষ হচ্ছে। ফুল চাষের সঙ্গে এখানকার প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কৃষক এবং প্রায় এক লাখ শ্রমিক সম্পৃক্ত। করোনার কারণে ফুলের বাজার বন্ধ রয়েছে। ক্ষেতে ফুল নষ্ট হচ্ছে। ফুলচাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা হিসেবে আউশ ধানের বীজ, টমেটোর চারা দিয়েছি।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিম বলেন, দেশের চাহিদার শতকরা ৬০-৭০ ভাগ ফুল যশোর থেকে সরবরাহ করা হয়। করোনার কারণে গত বছর পাঁচ মাস এবং এ বছরের তিন মাসে ফুল বিক্রির সুযোগ না থাকায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ফুল নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে শুধু যশোর অঞ্চলে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩০০ চাষীকে ২ কোটি টাকার মতো ঋণ দেয়া হয়েছে। করোনার কারণে চাষীদের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন শেষ। ফুলচাষীদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

ফুল

নীলবাসকের কথা

অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা ছিলেন চার্লস ডারউইনের ভাবশিষ্য। এতটাই যে ডারউইনকে ঘিরে রচনা করেছিলেন তিন-তিনটি বই। এমন অনুরক্তি থেকেই তিনি গিয়েছিলেন সাড়া জাগানো এই প্রকৃতিবিদের জন্মভিটা ইংল্যান্ডের শ্রুসব্যারিতে। কিন্তু আমার সাধ থাকলেও সাধ্যে ততটা কুলায়নি। আমি গিয়েছি আমার উদ্ভিদবিদ্যার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার প্রকৃতিদর্শনের আঁতুড়ঘর পাথারিয়া পাহাড়ে।

পারিবারিক সূত্রে পাওয়া একটি অনুচ্চ টিলা ও লাগোয়া পাহাড়ে ছেলেবেলায় দিনমান ঘুরে বেড়ানো দ্বিজেন শর্মার বাস্তুবিদ্যার হাতেখড়িও এখানেই। পাথারিয়ার এই স্বপ্নবোনা প্রকৃতির আবেগঘন বয়ান তাঁর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে। এই বন আমৃত্যু তাঁর ছায়াসঙ্গী ছিল। ‘কতিপয় সুদর্শন বনবৃক্ষ’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘আমার কৈশোর কেটেছে সিলেটের পাথারিয়া পাহাড়ের লাগোয়া অরণ্যঘেরা অঞ্চলে। সেখানকার গাছগাছালি-পাখপাখালি যে মনের গভীরে কতটা ছায়া বিস্তার করেছিল, একদিন টের পেলাম, যখন হঠাৎ মনে পড়ে, কবে কখন একটি লাল রঙের পাখি দেখেছিলাম ওই জঙ্গলে, নিশ্চিতই আলতাপরি, স্কারলেট মিনিভেট, আর সারা দিন সে আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখল, কোনো কাজেই মন বসানো গেল না। আরেক দিন মনে পড়ল একটি গাছের কথা, বেশ বড়সড়, লম্বা চ্যাপ্টা পাতা, ফুলগুলোও ঢাউস, বহু পাপড়ির, হয়তো ম্যাগনোলিয়ার কোনো প্রজাতি। বুনো ম্যাগনোলিয়া? অবিশ্বাস্য। বইপত্র খুঁজে হদিস মেলে। হ্যাঁ, বুনো ম্যাগনোলিয়াই বটে, দুলিচাঁপা, যার খোঁজ দীর্ঘদিন পাইনি।’ সুতরাং এমন একটি প্রকৃতি–তীর্থভ্রমণ আমাদের জন্য কতটা অপরিহার্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বর্ণখচিত এই পাহাড়ে না গেলে উদ্ভিদ অনুসন্ধানে অপূর্ণতা থেকেই যেত।

টিলায় ওঠার আগে সরু পথের ধারে রামবাসকের বনে যে অগ্নিরাঙা শোভায় চোখ জুড়িয়েছি, তার কোনো তুলনা হয় না। রামবাসকের এমন প্রাচুর্য আর কোথাও দেখিনি। ঢালে পেলাম দুর্লভ কালিকোরা এবং ঢাকিজামের গাছ। অনেক অচেনা গাছের ভিড়ে চোখ খুঁজছিল বড় পাতার সুউচ্চ এক বৃক্ষ। টিলার অন্য প্রান্তে পেয়ে গেলাম সেই গাছ, দুলিচাঁপা। তখন বনতলে অজস্র তৃণগুল্মের ভিড়ে চোখ আটকে গেল স্নিগ্ধ শোভার এই মায়াবী ফুলে। একেবারেই অচেনা। পাপড়ির গড়ন অনেকটা নয়নতারা ফুলের মতো। তবে রং ও পাতার গড়ন আলাদা। টিলার এক প্রান্তে বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি গাছ দেখা গেল। আসলে প্রস্ফুটন মৌসুম ব্যতীত উদ্ভিদটি সাধারণত আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। ফুলের ছবি দেখে বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সরদার নাসির উদ্দিন জানালেন, এটি অ্যাকেথাসিয়া পরিবারের ইরানথেমাম এসপিপি প্রজাতির উদ্ভিদ। ইংরেজি নাম ইস্ট-হিমালয়ান ইরানথেমাম। স্থানীয়ভাবে নীলবাসক নামেও পরিচিত।

পূর্ব হিমালয় অঞ্চলের ঝোপালো এই উদ্ভিদ তিন থেকে চার ফুট উঁচু হতে পারে। কাণ্ড ঈষৎ লোমশ। এক থেকে দুই ফুট উঁচু ফুলের একক স্পাইক খাড়া ধরনের। শাখাগুলো তীক্ষ্ণভাবে ৪-পার্শ্বযুক্ত। পাতা ফ্যাকাশে সবুজ, প্রায় ১০ সেন্টিমিটার লম্বা, মসৃণ, চকচকে, প্রান্ত কুঁচকানো বা ঢেউখেলানো এবং শিরাযুক্ত। গাঢ় নীল রঙের ফুলগুলো বড়, বিকল্প জোড়াগুলোর বিপরীতে থাকে, যা স্পাইকটি দীর্ঘায়িত হয়ে দূরবর্তী হয়ে যায়। শাখাবর্তী মঞ্জরি ঢাকনা গাঢ় সবুজ এবং প্রায় আড়াই সেন্টিমিটার লম্বা। গোড়ার দিকে নলাকার, পাতলা, মখমল-লোমশ এই ফুলের মুখের দিকে সামান্য বাড়ানো এবং বাইরের খাঁজ দৈর্ঘ্যের দ্বিগুণ হতে পারে। নীলবাসকের প্রাকৃতিক আবাস হিমালয়ের পূর্বাঞ্চল থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত। ফুল ফোটার মৌসুম জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

ফুল

ফুল তো আর মানুষের কথা শোনে না

করোনা নিয়ন্ত্রণে ‘কঠোরতম’ বিধিনিষেধে শুক্রবার ঢাকার সড়কগুলো ছিল অনেকটাই ফাঁকা। বিশেষ প্রয়োজনে চলেছে দু–একটা গাড়ি ও কিছু রিকশা। প্রয়োজন ছাড়া মানুষের বাইরে বেরোনো ঠেকাতে পুলিশ–আর্মির টহল ও নজরদারি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে এর মধ্যেও বেপরোয়া আচরণ করেছেন অসচ্ছল–অসহায় মানুষগুলো। তেমনই একটি ঘটনা দেখা গেল একজন ফুল বিক্রেতার।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুল শুকিয়ে যাওয়ার আতঙ্কে থাকা ওই ব্যক্তি বললেন, এ ছাড়া তাঁর আর কোনো ‘উপায় ছিল না’। বিধিনিষেধের জন্য ফুল তো আর না শুকিয়ে বসে থাকবে না।

আবারও হাসিহাসি মুখে বললাম, ‘আজ যে কঠোর বিধিনিষেধ শুরু হয়েছে জানেন না? ধরলে তো জরিমানা হবে।’ প্রশ্নের বিপরীতে তিনি যে প্রশ্ন করেন, তাতে আর উত্তর দেওয়ার কিছু থাকে না।

কিশোরগঞ্জের স্বপন বেশ কয়েক বছর ধরেই রাজধানীতে আছেন জীবিকার তাগিদে। আগে থাকতেন আদাবরে। কিছুদিন হলো ফার্মগেটের মনিপুরী পাড়ায় মেসে উঠেছেন।

কথা বলে সময় নষ্ট হচ্ছে, আবার আমিও পিছু ছাড়ছি না দেখে একপর্যায়ে আবার সেই গ্রিলের কাছে যান তিনি। শিস বাজিয়ে কেউ একজনকে ডাকেন। মুহূর্তের মধ্যে ওপাশ থেকে এগিয়ে আসে ছোট ছোট দুটি হাত। এপাশ থেকে এগিয়ে যান তিনি। এরপরে তাঁর হাতে উঠে আসে কয়েকটি বালতি আর গামলা। গামছা আর কাপড়ে ঢাকা। তখন স্পষ্ট হয় ব্যাপারটা।

স্বপনের একজন খুদে সহযোগী আছে। দুজন মিলে এতক্ষণ পুলিশের ভয়ে চন্দ্রিমা উদ্যানের গাছপালার ভেতর বসে ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি বেরিয়ে আসেন। তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে আসে তিনটি পাত্রভরা ফুল। দোলনচাঁপা প্রতি তোড়ায় ১০টি করে। এক তোড়ার দাম ১০০ টাকা। এক রঙের গোলাপ হলুদগুলোর তোড়া ২০০ টাকা। আছে ১৫ থেকে ১৮টি করে। তবে এগুলো লিচু কেনার মতো গুনে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাতে ফুল নষ্ট হবে। ফুল ক্রেতাকে নিতে হবে বিশ্বাস করেই। গোলাপের তা–ও বেশ কিছুক্ষণ টিকে থাকার সক্ষমতা আছে, কিন্তু দেশীয় দোলনচাঁপার তা নেই। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই ফুল মিইয়ে যাবে, তাই যত বেশি পাতা দিয়ে আর্দ্রতা ধরে রাখা যায়, সেই চেষ্টায়ই তাঁরা করছিলেন।

লকডাউনের এমন কড়াকড়ি পরিস্থিতির মধ্যেও স্বপন আজ আট হাজার টাকার ফুল এনেছেন। বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত একটি তোড়াও বিক্রি করতে পারেননি তিনি।

বিধিনিষেধের শুরুতে কাজটা কেন করলেন জানতে চাইলে তিনি বললেন, টাকা ঈদের আগেই দিয়ে বায়না করেছিলেন। ভেবেছিলেন বিধিনিষেধ আরেকটু দেরিতে শুরু হবে। ফুল সকালে সাভার থেকে আগারগাঁও এসেছে। সেখান থেকে রিকশায় করে এখানে নিয়ে এসেছেন।

নিরুপায় এই ফুল বিক্রেতা বলেন, ‘সমস্যা হইল এমন গরমে বেশিক্ষণ ভালো রাখা যাইতেছে না। বায়না করা থাকলে না নিয়া তো উপায় নাই।’

এতক্ষণে স্বপনের সেই সহযোগী আরও একটু সাহসী হয়। ওপাশের গাছপালার ভেতর থেকে ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। জিজ্ঞেস করলাম কে হয়? আমতা আমতা করে স্বপন জানান, কেউ হয় না, হেল্পার আর থাকে খায় তাঁর সঙ্গেই। ওপাশ থেকে ছোট হাতে এগিয়ে আসে পানির বোতল। স্বপন সে বোতল নিয়ে ফুলে ছিটিয়ে দিলেন। বললাম, গরমে তো সেদ্ধ হচ্ছে। কাল ভোরে ভোরে নিয়ে বের হলেই পারতেন।

পাল্টায় স্বপন বলেন, ‘আট হাজার টাকার ফুল। আমি বললেই না শুকায়া বইসা থাকব লকডাউন বইলা? ফুল কি মানুষের কথা শোনে?’

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন

শীর্ষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। দা এগ্রো নিউজ, ফিশ এক্সপার্ট লিমিটেডের দ্বারা পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। ৫১/এ/৩ পশ্চিম রাজাবাজার, পান্থাপথ, ঢাকা -১২০৫
ফোন: ০১৭১২-৭৪২২১৭
ইমেইল: info@theagronews.com, theagronewsbd@gmail.com