আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

বাংলাদেশ

খাদ্য লড়াইয়ে নারী: দিতে হবে রাষ্ট্রীয় সম্মান ও স্বীকৃতি

পুরুষের মতোই মাঠে আলু তুলছেন একদল নারী শ্রমিক।
পুরুষের মতোই মাঠে আলু তুলছেন একদল নারী শ্রমিক।

কৃষিতে কর্মরত নারীদের কৃষক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে, গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করতে হবে তাদের প্রত্যক্ষ অবদানকে। একইসঙ্গে কৃষকদের সহায়তার যেসব সরকারি কার্যক্রম রয়েছে তার প্রতিক্ষেত্রে নারী কৃষকদের কোটা থাকতে হবে

৮ মার্চ জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত নারীর অধিকার ও মর্যাদা উদযাপনের জন্য নির্ধারিত দিন। বাংলাদেশের ৮৮ শতাংশ গ্রামীণ নারী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজে জড়িত। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী দিবসের প্রাক্কালে গ্রামীণ নারীদের কথা, তাদের অবদান এবং লড়াইয়ের কথাগুলো আলোচনায় থাকাটা হবে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। 

বাংলাদেশের কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান বীরযোদ্বা মূলত নারীরাই। তাই নারী দিবসের সকল আয়োজন, আলোচনা কেবলমাত্র শহরে মধ্যবিত্ত নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামীণ নারীদের মধ্যে আনতে হবে, এবং সম্মান জানানো প্রয়োজন আমাদের খাদ্য লড়াইয়ের বীর নারীযোদ্ধাদের। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে, কৃষক, শ্রমিক, জেলে, গৃহকর্মীসহ অসংখ্য বৈচিত্র্যময় পেশার নারীদের খাদ্যের লড়াইয়ে পুঁজিবাদী ও পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্রমাগত শোষণ এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংহতি ও একাত্মতা প্রকাশ করছি। 

বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী কৃষকের অবদান নতুন করে আলোচনার কোনো অবকাশ রাখে না। বাংলাদেশে গ্রামীণ নারী কৃষকদের এই অবদান যে কেবলমাত্র খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে তা নয়। মানুষের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তা একটি আবশ্যক ধারা। অনেকে মনে করেন, খাদ্য নিরাপত্তা জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম সূচক। এতে কোনো দেশের মর্যাদা যেমন বাড়ে- অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হয়। বাংলাদেশে কৃষিকাজের সাথে যুক্ত আছেন ৬৮.১ শতাংশ নারী। গৃহস্থালীর সকল কাজের পাশাপাশি কৃষিকাজে নিয়োজিত নারী কৃষকদের ৭৪ শতাংশ গবাদিপশু পালন, ৬৩ শতাংশ স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ, ৪০ শতাংশ শাক-সবজি ও ফলমূল উৎপাদন, শস্য মাড়াই ও মাড়াই পরবর্তী কার্যক্রম, খাদ্যশস্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ কৃষিপণ্য উৎপাদনে যুক্ত থাকেন। বিবিএসের সর্বশেষ জরিপ (২০১৫) অনুযায়ী, গত এক দশকের ব্যবধানে দেশের কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ১০২ শতাংশ। সেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ কমেছে ২ শতাংশ। নারী তার নিজ যোগ্যতায় কৃষিখাতের হাল ধরছেন। ২০০০ সালে দেশের কৃষিতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৩৮ লাখ। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৫ লাখে। ১০ বছরের মধ্যে প্রায় ৭০ লাখ নারী কৃষিতে যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু, কৃষিতে নারীর ভূমিকা শুধু “সাহায্যকারী” হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারী হিসেবে নয়। 

কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্য নিরাপত্তায় নিশ্চিত করতে নারীরা একাধারে খাদ্য উৎপাদক, বীজ ও লোকায়ত জ্ঞান সংরক্ষক, কৃষি শ্রমিক; একই সাথে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং জীববৈচিত্র্যও সংরক্ষণ করেন। ২০০৮ সালে বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষিখাতে নিয়োজিত পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান শতকরা ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি। 

১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কৃষিতে নারীর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য হিসেবে “অন্ন জোগায় নারী” শ্লোগানটি নির্ধারণ করেছিল। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান মতে, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ মিলিয়ে কৃষিতে নারী কৃষকের হার ৪৩ শতাংশ। “রাইট টু ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন ওয়াচ-২০১৯” জানাচ্ছে, বিশ্বব্যাপী যে পরিমাণ ফসল উৎপাদিত হয়, তার ৮০ শতাংশই আসে পারিবারিক কৃষি থেকে। চাষের জন্য জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা ও বাজারজাতকরণের পূর্ব পর্যন্ত কৃষিখাতের ২১ ধরনের কাজের মধ্যে ১৭টিতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। 

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে বিষমুক্ত সবজি চাষ করে দেশব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন রিনা বেগম।
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে বিষমুক্ত সবজি চাষ করে দেশব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন রিনা বেগম।

বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন কৃষি-প্রণোদনা প্রদানের ক্ষেত্রে নারী কৃষকের পক্ষে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ২০১৮ সালে প্রণীত কৃষিনীতিতে  “নারী ক্ষমতায়ন” শিরোনামে একটি অধ্যায় সংযুক্ত হয়েছে এবং নারীকৃষকরা “কৃষিকার্ড” পাওয়া শুরু করেছেন; যা প্রশংসনীয়। কিন্তু কৃষিনীতিতে “নারীর ক্ষমতায়ন” শিরোনামে যে অধ্যায়টি সংযুক্ত হয়েছে সেখানে নারীদের অবদানের কথা এবং বিভিন্ন ধরণের সেবাপ্রাপ্তির বিষয়ে বলা হলেও “নারী- কৃষক” স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। সরকারি কৃষি উপকরণ প্রদানের ক্ষেত্রে যে বৃহৎ সংখ্যাক প্রান্তিক কৃষকের নাম দেখা যায় সেখানেও নারী কৃষকরা উপেক্ষিত থাকছেন; আবার যাদের নাম রয়েছে সেটিও শুধু তালিকায় নাম দেখানো বা কার্ড পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। পাশাপাশি সরকারের কৃষিপণ্য ক্রয়ে নারী কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য সরবরাহে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, ফলে স্থানীয় ও রাষ্ট্রিয়ভাবে নারী কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য বিপণনেও অবহেলার শিকার হচ্ছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষি থেকে পুরুষের সম্পৃক্ততা কমে যাচ্ছে। পুরুষের অবর্তমানে এই খাতে নারীদের সম্পৃক্ততা দ্রুত হারে বাড়ছে। গত সাত বছরে বাংলাদেশে কৃষিখাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও ভূমির মালিকানা এখনো পুরুষেরই হাতে। অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাতের এক গবেষণায় দেখা যায়, ভূমিতে গ্রামীণ নারীর মালিকানা মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ এবং বাকি ৯৬ শতাংশ জমির ব্যক্তি মালিকানা রয়েছে পুরুষের নামে। নারীর সম্পদহীনতা ও বৈষম্যের বিষয়টি রাষ্ট্রের নীতিতেও খুব স্পষ্ট। নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১-এর ১১নং দফায় বলা হয়েছে দেশের দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী শতকরা ৪০ ভাগ জনগোষ্ঠীর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ নারী। বৃহত্তর এই দরিদ্র, প্রান্তিক ভূমিহীন মানুষের ভূমিতে প্রবেশাধিকারের একমাত্র উপায় খাসজমি। বাংলাদেশের খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বণ্টন নীতিমালায় স্বামী-স্ত্রীর যৌথ মালিকানার বিধান থাকলেও নানাক্ষেত্রে তা নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক। এ সব নীতিকাঠামো ভূমিতে নারীর পূর্ণ অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে এবং সামগ্রিকভাবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। জমির মালিকানায় নারীদের অধিকার না থাকলে তারা বিভিন্ন আর্থিক সেবা গ্রহণ ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প হতে বঞ্চিত হয়। এখানে তানজানিয়ার একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে- দেশটিতে জমির মালিকানায় নারীদের অধিকার থাকার কারণে তারা ৩.৮ গুণ বেশি আয় করেন। ল্যাটিন আমেরিকার দেশ হন্ডুরাস ও নিকারাগুয়াতে নারীদের জমিতে সমঅধিকার থাকার কারণে পরিবারের আয়ে তারা পুরুষদের চেয়ে বেশি অবদান রাখেন। 

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাব মতে, নারীরা যদি উৎপাদনের জন্য সম্পদ পুরুষের সমপরিমাণ পেত, তাহলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কৃষি উৎপাদন আরও ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেত, যার ফলে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।

বাংলাদেশে গ্রামীণ খাদ্য ব্যবস্থাপনার বড় কারিগর গ্রামীণ নারীরা। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বছরপ্রতি দেশে বন্যা, ঘুর্ণিঝড়ের মতো ঘটনা ঘটে। তখন মূলত: নারীরা আপদকালীন সময়ের জন্য খাদ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। পাহাড়ি এলাকায় জুমে ইঁদুরের আক্রমণ, ফলন না হলে বা “আদিবাসীদের” সংস্কৃতিগত খাদ্য সঙ্কটে পড়লেও পরিবারের খাবারের যোগান দেন পরিবারের নারীরা। এক সময়ে শাক হিসেবে ১৫০টিরও বেশি গাছ-গাছালি বাংলার মেয়েরা খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতো এবং উৎপাদন করতো। কিন্তু তথাকথিত বাণিজ্যিক ও আধুনিক কৃষি নারীদের এই বিপুল ব্যবহারিক জ্ঞানকে অস্বীকার করে বাজারনির্ভর খাদ্য ও ওষুধনির্ভর রাষ্ট্রীয়ব্যবস্থার ফলে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়ে। বর্তমানে কৃষিতে প্রযুক্তির সংযোজনের কৃত্বিত্বের কথা বলা হয়। কিন্তু এখনও পর্যন্ত নারীবান্ধব কোনো প্রযুক্তি নারীকৃষকের কাছে পৌঁছায়নি। নারীদের এ ক্ষেত্রে পুরুষের ইচ্ছা, অনিচ্ছা ও সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হয়। কৃষিঋণ বিতরণের জন্য ব্যাংক একাউন্টের আওতায় অতি দরিদ্র নারীরা অন্তুর্ভূক্ত থাকলেও ঋণ বা ভর্তুকি সহায়তা নারীকৃষকরা কতখানি পেয়ে থাকে তা রীতিমত অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে। নারীদের যথাযথ মাত্রায় কৃষিঋণ ও ভর্তুকি সহায়তা না পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো পুরুষ কৃষকের ন্যায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে নারী কৃষকের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো “ডাটাবেজ” এর উপস্থিতি না থাকা। যদিও “সিডও” সনদের ১৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কৃষি ঋণ-আর্থিক সুবিধা, বাজারজাতকরণ সুবিধা, প্রযুক্তি সুবিধা, ভূমি সংস্কার ও ভূমি পুনর্বাসনে নারী ও পুরূষের অধিকার সমান হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। 

পুরুষের পাশাপাশি ধান রোপণ করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের এক নারী শ্রমিক।
পুরুষের পাশাপাশি ধান রোপণ করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের এক নারী শ্রমিক।

নয়া উদারনীতির বাজার অর্থনীতি অনুসরণের ফলে আজকের দিনে একজন হতদরিদ্র নারীকেও তার উৎপাদিত দুধ বাজারজাত করতে গিয়ে চরম অসম প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে উন্নত বিশ্বের বৃহৎ খামারি বা বহুজাতিক কোম্পানির সাথে। বাজারে নারীর প্রবেশাধিকার কিংবা নারীবান্ধব বাজার ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে সরকার ৬০টি গ্রোয়ার্স মার্কেট ও ১৫টি পাইকারি বাজারে নারীদের জন্য আলাদা কর্ণার করে দিয়েছে। কিন্তু এসব কর্ণার নারীদের কতটা কাজে আসছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ, পুরো বাজার ব্যবস্থাটাই নারীবান্ধব নয় বিধায় এসব বাজারে নারী ব্যবসায়ীগণ বিশেষ করে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাগণ প্রবেশ করতে পারছেন না। 

এই প্রেক্ষাপটে, যখন সমাজের অধিকাংশ প্রান্তিক কৃষিজীবী, নারী এবং পুরুষ উভয়ের ওপর বাণিজ্যিক কৃষি এবং খাদ্য উৎপাদনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে; কাঠামোগত সহিংসতা ও রাজনীতির বস্তুগত প্রভাব- বিশেষ করে নারী কৃষকের জীবনে কঠোরতর হচ্ছে; জাতি, শ্রেণী এবং গোষ্ঠীভেদে এই সংকটও আরো ঘণীভূত হচ্ছে। একই সাথে- 

–    কৃষিজ কর্মকাণ্ডে প্রধান কুশীলব হয়েও নারীরা “কৃষক” হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায় না;

–    সংস্কৃতি ও আইনি ব্যবস্থার কারণে ভূমিতে নারীদের প্রবেশাধিকার প্রসারিত হচ্ছে না; 

–    সমুদ্র উপকূলবর্তী এবং দূরবর্তী মৎসশিকারের কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা সত্ত্বেও যখন নারীরা “জেলে” হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে না; 

–    যখন বৈশ্বিক বাণিজ্যিক খাদ্যব্যবস্থা নারীর দৈনিক অবৈতনিক পরিচর্যা এবং গৃহস্থালি কাজের ওপর নির্ভর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে 

তখন বৈশ্বিক অধিকার সংগঠনগুলোর সাথে সাথে আমরাও এটিকে “নারীর প্রতি সহিংসতা” হিসেবেই বিবেচনা করছে। 

ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বেচ্ছাচারী ব্যবস্থার আড়ালে লুকায়িত শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতা, অধিকারহরণ, প্রতিবাদ নির্মূলকে অনুপ্রেরণাদায়ী সকল দেশীয়, আন্তঃদেশীয়, বহুজাতিক রীতির আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাই। নারী প্রতি সহিংসতা এবং শোষণের কোনো দেশ-কাল-পাত্র নেই। বিশ্বব্যাপী নারীদের বৃহদায়তনে সমাবেশ, সংহতি, সংগ্রামের গতিবিধি এবং অভিব্যক্তি নারীর প্রতি সব ধরণের সহিংসতা এবং নিপীড়ন বন্ধের দাবির গুরুত্ব অনুমোদন করে। নারীর অধিকার নিশ্চিত করার পরিবর্তে ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণকে অস্বীকার করে যে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা শোষণকারীদের দায় থেকে মুক্তি দেয় সেই ব্যবস্থার নিন্দা জানাই। 

জমির অধিকার, উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার অধিকার, বিষাক্ত কৃষি-রাসায়নিকমুক্ত উৎপাদন নিশ্চিত করতে এবং কৃষি প্রতিবেশ প্রচারের মাধ্যমে খাদ্যের সার্বভৌমত্ব অর্জনের পথে স্বাস্থ্যকর খাদ্য উৎপাদনে নারী কৃষকের অত্যাবশ্যক ভূমিকা ও নিত্যপণ্যের রক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আমরা কৃষকদের অধিকার সম্পর্কিত জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নের জোর দাবি জানাই। 

কৃষিতে কর্মরত নারীদের কৃষক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে, গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করতে হবে তাদের প্রত্যক্ষ অবদানকে এবং সে অনুযায়ী কৃষিনীতিসহ অন্যান্য নীতিমালা সংশোধন/পরিমার্জন করা; সকল রাষ্ট্রীয় নীতি, প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ, ঋণ কার্যক্রম ইত্যাদিতে নারী কৃষকের সমান অধিকার প্রদান; কৃষি ও পল্লীঋণ কর্মসূচির আওতায় নারী কৃষকদের মাঝে পর্যাপ্ত ঋণ বিতরণের সুযোগ সৃষ্টি করা; কৃষকদের সহায়তা করার জন্য যে সমস্ত সরকারি কার্যক্রম রয়েছে সেখানে নারী কৃষকদের জন্য কোটা থাকা প্রয়োজন এবং এ বিষয়টি জাতীয় কৃষিনীতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার দাবি জানাই। 

  • পুরুষের পাশাপাশি ধান রোপণ করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের এক নারী শ্রমিক।

    পুরুষের পাশাপাশি ধান রোপণ করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের এক নারী শ্রমিক।

  • টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে বিষমুক্ত সবজি চাষ করে দেশব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন রিনা বেগম।

    টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে বিষমুক্ত সবজি চাষ করে দেশব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন রিনা বেগম।

  • পুরুষের মতোই মাঠে আলু তুলছেন একদল নারী শ্রমিক।

    পুরুষের মতোই মাঠে আলু তুলছেন একদল নারী শ্রমিক।

  • পুরুষের পাশাপাশি ধান রোপণ করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের এক নারী শ্রমিক।
  • টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে বিষমুক্ত সবজি চাষ করে দেশব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন রিনা বেগম।
  • পুরুষের মতোই মাঠে আলু তুলছেন একদল নারী শ্রমিক।

পরিবেশ

বন্যার আঘাত বাংলাদেশে (২০১৯)

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

অন্যান্য

বুলবুল এর আঘাত বাংলাদেশে

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

পরিবেশ

করোনা আম্ফান আর কালবৈশাখীতে দিশেহারা লিচুচাষিরা

 করোনা আম্ফান আর কালবৈশাখীতে দিশেহারা লিচুচাষিরা
করোনা আম্ফান আর কালবৈশাখীতে দিশেহারা লিচুচাষিরা

একের পর এক দুর্যোগে দিনাজপুরের লিচুচাষি ও ব্যবসায়ীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। করোনার মাঝেই সুপার সাইক্লোন আম্ফান ও সর্বশেষ দফায় দফায় কালবৈশাখী ঝড়ে দিনাজপুরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন লিচুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। লিচুসহ নানা মৌসুমী ফল গাছ থেকে পাড়ার আগেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে গাছেই নষ্ট হয়েছে বেশি। ফলে ক্ষতির মুখে আম, কাঁঠাল, লিচু, ধান, পাট, ভুট্টা, শাকসবজি ও গ্রীষ্মকালীন তরিতরকারি চাষিরা। ফসল নষ্ট হওয়ায় সর্বশান্ত হওয়ার পথে দিনাজপুরের অধিকাংশ কৃষক।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. তৌহিদুল ইকবাল জানান, করোনা, আম্ফান আর দফায় দফায় কাল বৈশাখী ঝড়ে সাড়ে ৭ কোটি টাকা শুধু লিচুতেই ক্ষতি হয়েছে।

 করোনা আম্ফান আর কালবৈশাখীতে দিশেহারা লিচুচাষিরা
করোনা আম্ফান আর কালবৈশাখীতে দিশেহারা লিচুচাষিরা

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের দেয়া তথ্যে জানা যায়, দিনাজপুরে এবার সাড়ে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়েছে। আম্ফান আর দফায় দফায় কালবৈশাখী ঝড়ে প্রায় সাড়ে ৩শ হেক্টর জমির লিচু নষ্ট হয়েছে। দিনাজপুর সদর, বিরল ও চিরিরবন্দর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি লিচুর ক্ষতি হয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য ফল ও ফসলের ক্ষতি নিরুপণে কাজ করছে কৃষি বিভাগ।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

পরিবেশ

বাঁধভাঙা উপকূল

বাঁধভাঙা উপকূল
বাঁধভাঙা উপকূল

বাংলায় একটি বাগধারা প্রচলিত আছে, ‘গদাই লস্করি চাল’। নিশ্চয়ই শুনেছেন। না শুনলেও বাংলা ব্যাকরণ বইয়ে পড়েছেন নিশ্চয়ই। সাধারণত অলস, কাজ করার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যেই এই বাগধারার ব্যবহার। প্রাচীনকালে যুদ্ধে ব্যবহৃত এক ধরনের অস্ত্র হচ্ছে গদা। যে ব্যক্তি গদা বহন করে তাকে বলা হয় গদাই। অন্যান্য অস্ত্রের তুলনায় গদা ছিল ভারী। লস্কর বা লশকর হচ্ছে সৈনিক। তো যে সৈনিকরা যুদ্ধের মাঠে গদা বহন করত তাদের বলা হতো গদাই লস্কর। গদা ভারী বলে গদাই লস্করদের চাল-চলনের গতি হতো ধীর। ফলে অন্য সৈন্যরা যখন যুদ্ধের ময়দানে অনেক দ্রুত চলাফেরা করতে পারত গদাই লস্কররা পারত না। এই ভারী অস্ত্র বহন করার অজুহাতে তাদের ভিতর কাজকর্মে বেশ ঢিলেমি ভাব চলে আসত। সেই থেকে এই বাগধারার প্রচলন। যারা বাস্তব জীবনে অলস, কাজকর্মে অনীহা, গতিকম। ঠিক সময়ে কাজ শেষ করতে পারে না, তখন তাদের বলা হয় ‘যা শুরু করেছ বাপু! গদাই লস্করি চালে কাজ করলে চলবে? সব যে রসাতলে যাবে!’ আমাদের দেশে বাঁধ নির্মাণের কাজগুলোও মূলত গদাই লস্করি চালে হয়। দিনের পর দিন চলে যায় কিন্তু বাঁধ নির্মাণের কাজ আর শেষ হয় না। আমাদের দেশে বাঁধ নির্মাণের দায়িত্বে থাকে পানি উন্নয়ন বোর্ড। বছরের বিভিন্ন সময় বাঁধ নির্মাণে তাদের অনীহার খবর সংবাদ মাধ্যমগুলোতে পাওয়া যায়। অভিযোগ থাকে নামমাত্র বাঁধ সংস্কার হয়, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে তারা কাজটা করে না। যে পয়েন্টে বাঁধ ভাঙে জোড়াতালি দিয়ে সেখানে তা সংস্কার হয়। তখন আবার অন্য অংশে ভাঙন দেখা দেয়। বছরের পর বছর চলে যায় তাদের এই কাজ আর শেষ হয় না।

২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলায় খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ উপকূলের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৫৯৭ কিলোমিটার বাঁধ পানির তোড়ে ভেসে যায়। উপকূলের মানুষের দাবি ছিল, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের। সরকারেরও আশ্বাস ছিল, বাঁধ হবে। প্রকল্পও চালু হয়। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়, কাজ শেষ হয় না। আইলার পর ১১ বছরেও তা নির্মিত হয়নি। উপরন্তু জোড়াতালি দিয়ে বাঁধ সংস্কারে অর্থের অপচয় ও প্রকল্পে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, উন্নয়নকর্মী ও ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলবাসী। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রেই বলি, আইলার পর ‘উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প ফেজ-১’ এর আওতায় খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনায় ৬২৫ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্নির্মাণে বৃহৎ প্রকল্প নেওয়া হয়। এ ছাড়া ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন প্রকল্প (২য় পর্যায়), ২৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বাগেরহাট জেলার ৩৬/১ পোল্ডারে পুনর্বাসন প্রকল্প, ৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনার দাকোপে ৩১ নং পোল্ডার এবং বটিয়াঘাটায় ৩০ ও ৩৪/২ পোল্ডারে বাঁধ পুনঃসংস্কারের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। সাতক্ষীরা অঞ্চলে বাস্তবায়ন করা হয়েছে অবকাঠামো পুনর্বাসন (দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল) প্রকল্প, নদী তীর সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্প (৪র্থ পর্যায়), এফডিআর-২০০৭ (ওয়ামিপ) প্রকল্প। কিন্তু এতসব প্রকল্পের ফলাফলটা কী?

বাঁধভাঙা উপকূল
বাঁধভাঙা উপকূল

গত বছরের ৪ মে ঘূর্ণিঝড় ফণীতে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ ধসে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। গত বছর বাগেরহাটে কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেটে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের উপস্থিতিতে বেশ কয়েকজন কৃষকের অভিযোগ ছিল বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম। স্থানীয় অধিবাসীরা বলছিলেন, নানা অনিয়মের কারণে বাঁধ সংস্কারের কিছু দিনের মধ্যে তা আগের চেহারায় ফিরে যায়। এলাকাবাসীর অভিযোগ ছিল, নদী তীরে চরের মাটি কেটে বাঁধ উঁচু করা হয় ঠিকই। কিন্তু বাঁধের ঢাল না থাকায় বাঁধ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। নকশা না মেনেই অনেক স্থানে বাঁধের ঢালটা ১ থেকে দেড় ফুট কমিয়ে ফেলা হয়। মাটি বিক্রি নিয়ে আর্থিক অনিয়মে জড়িয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী ও ঠিকাদারের লোকজন। যে ঠিকাদার কাজ পায়, তিনি কাজ পাওয়ার পর নির্দিষ্ট কমিশনে কাজটি অন্য ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে দেন। ওই ঠিকাদার আবার তার কমিশন রেখে কাজটি ছোট ছোট অংশে ভাগ করে অন্য ঠিকাদারদের হাতে দেন। এই হাত বদলের পর মাঠপর্যায়ে ৪০-৪৫ ভাগ বরাদ্দ পাওয়া যায়। ফলে বাঁধ নির্মাণ হলেও, সে বাঁধের কোনো বাধা দেওয়ার শক্তি থাকে না। এ বছরের বাঁধ পরের বছর আসতে না আসতেই বিলীন হয়ে যায়। মনে আছে সৌদি আরবের তায়েফে প্রায় চৌদ্দশ বছর আগের একটা বাঁধ দেখে এসেছিলাম। তায়েফ একটি কৃষিসমৃদ্ধ ও ঐতিহাসিক অঞ্চল। তায়েফকে কৃষি উপযোগী করে তোলা হয়েছিল। আর তাই ছোট-বড় প্রায় ৭০টির মতো প্রাচীন ড্যাম বা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই ৭০টি বাঁধের মধ্যে ২০টির অস্তিত্ব এখনো আছে। এর মাঝে একটি ড্যাম যেটি মুয়াবিয়া ড্যাম নামে পরিচিত। তায়েফ থেকে ১২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ড্যামটি সায়েসাদ উপত্যকায় নির্মাণ হয়েছিল ৫৮ হিজরিতে। ওয়াদে আল খানাক নামে এক জায়গায় বাঁধটি নির্মাণ করা হয়। এই এলাকায় পূর্বে বন্যা হতো। বন্যার কারণে কৃষি জমি ভেসে যেত, সঙ্গে সঙ্গে ভেসে যেত বসতিও। উমাইয়া খলিফা মুয়াবিয়ার শাসনামলে বন্যার কারণ হিসেবে খুঁজে বের করা হলো, দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী উপত্যকা দিয়ে পানি এসে বন্যা হয়। তাই বন্যার হাত থেকে ফসল ও মানুষকে রক্ষা করতে এই উপত্যকায় বাঁধ নির্মাণ করা হয়। হাজার বছরে ভূ-প্রকৃতি বদলেছে, বদলেছে আবহাওয়া। কিন্তু বাঁধটি এখনো আছে। বাঁধের গায়ে সেই সময়কার হাতের লেখাটাও রয়ে গেছে কালের সাক্ষী হয়ে। পৃথিবীতে ৩৩টি দেশের বিভিন্ন স্থান আছে যা সমুদ্রের জলতলের থেকে অনেক নিচুতে অবস্থান। বাঁধ নির্মাণ করে সেসব অঞ্চলে মানুষ নিরাপদ বসতি গড়েছে। এমন একটি দেশ নেদারল্যান্ডস। নেদারল্যান্ডসের কৃষি, কৃষি যন্ত্রপাতি, কৃষি অর্থনীতি ও বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ে জানতে বুঝতে নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন শহরে ও এলাকায় আমার যাওয়া হয়েছে। দেশটির স্থলভাগের উচ্চতা সমুদ্রের জলতলের থেকে অনেক নিচু। দেশটির প্রায় অর্ধেক অংশই সমুদ্রের জলতলের প্রায় সাত মিটার নিচে। তাই বাঁধ দিয়ে পুরো দেশটা ঘিরে রাখা হয়েছে। তবে সে বাঁধ আমাদের দেশের মতো নয়, যে সামান্য জলোচ্ছ্বাসেই ভেঙে যাবে! নেদারল্যান্ডসের রাজধানী ও অন্যতম প্রধান শহর হচ্ছে আমস্টারডাম। এ নামটাই এসেছে Amstel Dam আমস্টল ড্যাম থেকে। অর্থাৎ ‘আমস্টেল নদীর বাঁধ’। 

বাঁধভাঙা উপকূল
বাঁধভাঙা উপকূল

আমাদের কেন বাঁধ নির্মাণে এত গড়িমসি। সমস্যাটা কোথায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় কয়রাবাসীর হাঁটু পানিতে ঈদের নামাজ আদায়ের ছবিটা ভাইরাল হয়েছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু বাঁধের কারণে এলাকাবাসীর যে কষ্ট বছরের পর বছর সহ্য করতে হচ্ছে সেটা কি আমরা অনুভব করতে পেরেছি? পারলে বাঁধ নির্মাণে কেন এত দীর্ঘসূত্রতা। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ব্লু-গোল্ড প্রোগ্রামের কথাই যদি বলি। তাদের ওয়েবসাইট থেকেই পাওয়া তথ্য। প্রকল্প অনুমোদন হয় ২০১৩ সালের জুলাইয়ে। উপকূলীয় জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী এবং বরগুনার নির্বাচিত মোট ২২টি পোল্ডারে ব্লু-গোল্ড প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের কথা। মোট প্রকল্প এলাকা ১১৯,১২৪ হেক্টর। বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ২০১৮ সালে। কিন্তু ২০২০ সালে এসেও প্রকল্পের ২০-৩০% কাজ নাকি এখনো বাকি রয়ে গেছে। সাত বছরেও প্রকল্প শেষ হচ্ছে না। অথচ বাংলাদেশের দীর্ঘতম বাঁধ কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করতে সাড়ে পাঁচ বছর লেগেছিল। মানছি বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাঁধ নির্মাণের কাজকে ব্যাহত করছে। এ ক্ষেত্রে আমার শৈশবের পাটীগণিতের কথা স্মরণ করতে পারি। ‘একটি কাজ ৫ জন লোকে শেষ করতে ১০ দিন সময় লাগে। কাজটি ১০ জন লোকে করলে কতদিন সময় লাগবে?’ শৈশবে এ জাতীয় অঙ্ক শিখেই আমরা বড় হয়েছি। বাঁধের কাজগুলোতে যেহেতু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকে, সেহেতু সেগুলো দ্রুত সময়ে শেষ করার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামা উচিত। শুধু উপকূলীয় অঞ্চলেই নয়, হাওর অঞ্চলেও বাঁধ নির্মাণ নিয়ে প্রচুর অভিযোগ রয়েছে। আমি বিভিন্ন হাওর এলাকায় ঘুরে কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, পাহাড়ি ঢল আসার আগে আগে বাঁধ নির্মাণে কয়েক বস্তা মাটি ফেলা হয় বটে কিন্তু ঢলেই সে মাটি ধুয়ে চলে যায়। উন্নয়ন কাজ বছরের পর বছর চলতে থাকে ঠিকই উন্নয়ন আর হয় না।

আইলায় নদীর প্রবল ভাঙনে শাকবাড়িয়া, কপোতাক্ষ ও কয়রা নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের বসতভিটা, আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। গাছপালা শূন্য কয়রা উপজেলার পরিবেশ এখনো সম্পূর্ণ ফিরে পায়নি তার আগের রূপ। যে কারণে শুষ্ক মৌসুমে প্রচণ্ড তাপদাহে মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। লবণাক্ততার কারণে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমিতে কৃষকরা আজো ঠিকমতো ফসল ফলাতে পারে না। আইলার ভয়াবহতায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়ন। ওই এলাকায় পা দিলেই ১০ বছর আগে ঘটে যাওয়া আইলার চিহ্ন এখনো স্পষ্ট দেখা যায়, যা না দেখলে মানুষ অনুমান করতে পারবে  না-২৫ মে, ২০০৯ সালে সেখানে কী ঘটেছিল। এরপর কয়েক বছর পরপরই তাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে নানা নামের ঘূর্ণিঝড়ের। শেষ ছোবল হানে আম্ফান। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে যতটা না ক্ষতি হয়েছে, বাঁধ ভেঙে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সাতক্ষীরার উপকূলীয় মানুষের। একটি ঝড়ের রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতে আঘাত হানে আরেকটি ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস। এতে নষ্ট হয়ে যায় তিলে তিলে গড়া সম্পদ।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস ও অতিবৃষ্টিতে বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এতে জোয়ারের পানি প্রবেশ করতে থাকে মানুষের বাড়িঘরে। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে জেনেছি, এক সপ্তাহ পার হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) না পেয়ে অধিকাংশ এলাকায় স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণে নেমে পড়েছেন স্থানীয়রা। কিন্তু নদীতে প্রবল জোয়ারের কারণে বাঁধ টেকানো যাচ্ছে না। এক পাশে বাঁধ নির্মাণ করে বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই আরেক পাশের বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

বছরের পর বছর উপকূলীয়, নদী তীরবর্তী ও হাওরাঞ্চলের মানুষের সীমাহীন কষ্ট দেখে আসছি। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করতে করতে মানুষগুলো ক্লান্ত। অথচ সরকার নানা প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করে চলেছে। কিন্তু পেরে উঠছে না। সমস্যাটা কোন জায়গায় সেটা চিহ্নিত করতে হবে। দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। গলদটা পরিকল্পনায়, না বাস্তবায়নে সেটা যেমন খুঁজে বের করতে হবে তেমনি ভাবতে হবে নতুন করে। বলছিলাম, নেদারল্যান্ডসের কথা। বাঁধ নির্মাণ করে একটি দেশ টিকিয়ে রেখেছে তাদের সভ্যতাকে, নির্মাণ করেছে কৃষি অর্থনীতির নতুন ধারা, ফুলের জগৎ বলতেই আমরা বুঝি নেদারল্যান্ডস। পাশাপাশি সমুদ্রের জলতলকে সমান রাখার জন্য আরও একটি উপায় অবলম্বন করেছে নেদারল্যান্ডস। দেশজুড়ে প্রচুর খাল কাটা আছে। নদীর মাধ্যমে সমুদ্রের সঙ্গে এই খালগুলোর যোগাযোগ আছে। এভাবে ভৌগোলিক সমস্যাকে তারা যেমন অতিক্রম করেছে, তেমনি খালগুলোকে জলপথ হিসেবে ব্যবহার করতে পারছে।  এতে জলপথে সমগ্র দেশেই ভ্রমণের,  পণ্য পরিবহন করা যায়।

বছরের পর বছর বাঁধ সংস্কারের নামে জলে টাকা না ফেলে সত্যিকার কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে বাঁধ নির্মাণ করে উপকূলের এই মানুষগুলোর জীবন  ও সম্পদ রক্ষা করা জরুরি।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

এগ্রোবিজ

মৌসুমি ফল অনলাইনে বিক্রি

মৌসুমি ফল অনলাইনে বিক্রি
মৌসুমি ফল অনলাইনে বিক্রি

কৃষকের বাগান ও খেতে পেকে ওঠা আম–লিচু ও তরমুজ যাতে নষ্ট না হয়, ফলগুলো যাতে দ্রুত ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য বিপণনের নতুন এক কৌশল নিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়। ভোক্তা ও চাষিদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে প্রথমত হাটবাজারগুলোকে কাজে লাগানো হবে। সেই সঙ্গে এবার এ কাজে অনলাইন পণ্য বিপণনের প্ল্যাটফর্ম ও সুপারশপগুলোকে কাজে লাগানো হবে।

সম্মিলিত এ উদ্যোগ নিয়ে গতকাল শনিবার এক ব্যতিক্রমী সভার আয়োজন করে কৃষি মন্ত্রণালয়। সভায় সরকারের চারজন মন্ত্রী, ১৭ জন সাংসদ, সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, দেশের শীর্ষস্থানীয় ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ কোম্পানি, পরিবহনমালিক ও শ্রমিকনেতারা উপস্থিত ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুমে অনুষ্ঠিত ওই সভায় প্রত্যেকেই কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও তরুণদের উদ্যোগে তৈরি হওয়া পণ্য বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

সভার শুরুতে কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বর্তমানে বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রভাবে বাংলাদেশের শাকসবজি ও মৌসুমি ফলসহ কৃষিপণ্যের পরিবহন এবং বাজারজাতকরণে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করতে পারছেন না। বড় শহরের বাজারে ক্রেতার আগমন প্রায় না থাকায় ও জনগণের আয় কমে যাওয়ায় বাজারে কৃষিপণ্যের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কৃষিপণ্যের বিপণন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পাঠাও, চালডালের মতো পণ্য বিপণন প্রতিষ্ঠান, স্বপ্ন ও আগোরার মতো সুপারশপগুলোকে কাজে লাগানো হবে।

সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ট্রাকসহ অন্যান্য পরিবহনের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করার উদ্যোগ নিতে হবে। ট্রাকের জ্বালানির ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে, যাতে ট্রাকের ভাড়া কম হয়। পুলিশ ব্যারাক, সেনাবাহিনীর ব্যারাক, হাসপাতাল, জেলখানাসহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে কৃষকের কাছ থেকে আম কিনে সরবরাহ করা গেলে আমের বাজারজাতকরণে কোনো সমস্যা হবে না বলেও মনে করেন তিনি।

আম–লিচু নিয়ে চাষি ও ভোক্তার মধ্যে সংযোগ ঘটাবে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম।
পাঠাও, চালডাল, স্বপ্ন ও আগোরাকে কাজে লাগানো হবে।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, বিদেশি ফল যেমন আপেল, আঙুর প্রভৃতি আমদানি কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, গত কয়েক বছরে আমের ভালো দাম না পাওয়ায় রাজশাহীতে আম চাষ কমে যাচ্ছে। ব্যবসায়ী ও ফড়িয়াদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে পরিচয়পত্র ইস্যু, তাঁদের যাতায়াতে হয়রানি কমানো, ব্যাংকের লেনদেনের সময়সীমা বাড়াতে হবে।

সভায় জানানো হয়, এ বছর ১ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে এবং প্রত্যাশিত উৎপাদন ২২ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন ধরা হয়েছে। লিচুর আবাদ হয়েছে প্রায় ৩২ হাজার হে

ক্টর জমিতে এবং প্রত্যাশিত উৎপাদন ২ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন।

সভায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংস্থাপ্রধান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, দিনাজপুর ও সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক, দেশের শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানিকারক সমিতি, সুপারশপ মালিক সমিতি, আম-লিচু চাষি, ব্যবসায়ী ও আড়তদার এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা সংযুক্ত ছিলেন।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন

শীর্ষ সংবাদ

© স্বত্ব দা এগ্রো নিউজ, ফিশ এক্সপার্ট লিমিটেড দ্বারা পরিচালিত - ২০২০
ফোন: ০১৭১২-৭৪২২১৭
ইমেইল: info@theagronews.com