আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন

জৈব

করোনা ভাইরাস: অক্সফোর্ডের উদ্ভাবিত টিকা বানানোর জন্য তৈরি ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট

কোভিড-১৯র টিকা বানানোর জন্য প্রায় শতাধিক প্রকল্প চলছে বিভিন্ন দেশে
কোভিড-১৯র টিকা বানানোর জন্য প্রায় শতাধিক প্রকল্প চলছে বিভিন্ন দেশে

ভারতের পুনে-ভিত্তিক সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, কোভিড-১৯র জন্য অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির বানানো টিকা তারা শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত।

বিশ্বের বৃহত্তম টিকা প্রস্তুতকারী এই সংস্থাটি অক্সফোর্ডের ওই প্রকল্পে অন্যতম প্রধান পার্টনার বা অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।

সংস্থার প্রধান আদার পুনাওয়ালা বলেছেন, তারা ভারতে ওই টিকার ক্লিনিকাল ট্রায়ালের জন্য সরকারের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কাছে আবেদন করছেন – পাশাপাশি বিপুল সংখ্যায় ওই টিকা উৎপাদনের জন্য তাদের অবকাঠামোও পুরোপুরি তৈরি।

তবে সেরাম ইনস্টিটিউটের বানানো টিকা দেশের বাজারে ঠিক কখন আসতে পারে, তা নিয়ে দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও নানা মত আছে।

সবেমাত্র সোমবারেই ঘোষণা করা হয়েছে যে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির উদ্ভাবিত কোভিড-১৯ টিকা মানবশরীরের জন্য নিরাপদ এবং এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উজ্জীবিত করতে পারে বলে প্রাথমিক পরীক্ষায় প্রমাণিত।

এই টিকার ১০ কোটি ডোজের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাদের চাহিদা ইতিমধ্যেই জানিয়ে রেখেছে – আর এটির লার্জ স্কেল বা বিপুল সংখ্যায় উৎপাদনের জন্য অক্সফোর্ড বিশ্বের যে সাতটি সংস্থার সঙ্গে সমঝোতা করেছে তার অন্যতম হল পুনের সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া।

ওই সংস্থার সিইও আদার পুনাওয়ালা জানিয়েছেন, ভারতে ওই টিকার ক্লিনিকাল ট্রায়ালের জন্য তারা এ সপ্তাহেই আবেদন করছেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সেরাম ইনস্টিটিউটের কর্ণধার আদার পুনাওয়ালা
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সেরাম ইনস্টিটিউটের কর্ণধার আদার পুনাওয়ালা

মি. পুনাওয়ালা আরও বলেন, “এই টিকা উৎপাদনের জন্য আমরা অক্সফোর্ডের প্রধান অংশীদারদের একজন – এবং ভারতে আমরাই একমাত্র সংস্থা যারা এই দায়িত্ব পেয়েছে।”

“আমি আগেই একটা বিবৃতিতে জানিয়েছি, আমরা কিন্তু সম্পূর্ণ নিজেদের খরচে ও নিজেদের ঝুঁকিতে এই টিকার উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছি।”

“ক্লিনিকাল ট্রায়াল ব্যর্থ হলে সেই উদ্যোগ হয়তো জলে যাবে।”

“কিন্তু আমাদের বিশ্বাস একটা ইতিবাচক ফলাফল নিশ্চয় পাওয়া যাবে এবং সে ক্ষেত্রে আমরা কিন্তু প্রায় ছসাত মাস সময় বাঁচাতে পারব … এই টিকা বাজারে আনার ক্ষেত্রে একটা ‘হেডস্টার্ট’ পাব বা অনেক এগিয়ে থেকে শুরু করব।”

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একটা নতুন রোগের টিকা বানাতে দশ বছর সময়ও লেগে যেতে পারে – কারণ সেখানে গবেষণা ও উদ্ভাবন ছাড়াও ক্লিনিকাল ট্রায়ালের অনেকগুলো ধাপ জড়িত থাকে।

কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারি সারা দুনিয়াকে একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে, তাই কয়েক বছরের প্রক্রিয়াটাকে কয়েক মাসের মধ্যে ‘ফাস্ট ফরোয়ার্ড’ করার চেষ্টা চলছে বহু দেশেই।

দিল্লির হিন্দুস্তান টাইমসের স্বাস্থ্য-বিষয়ক সম্পাদক সঞ্চিতা শর্মা মনে করছেন, এই পটভূমিতে বছর শেষ হওয়ার আগেই সিরাম ইনস্টিটিউটের টিকা বাজারে চলে আসবে এই প্রত্যাশা করা যেতেই পারে।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির উদ্ভাবিত টিকার ট্রায়ালে প্রাথমিক সাফল্য ঘোষিত হয়েছে ২০শে জুলাই
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির উদ্ভাবিত টিকার ট্রায়ালে প্রাথমিক সাফল্য ঘোষিত হয়েছে ২০শে জুলাই

তিনি বলছিলেন, “পুনের সিরাম ইনস্টিটিউট ইতিমধ্যেই এই টিকার উৎপাদন শুরু করে দিয়েছে।”

“এখন আমার জানা মতে, সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যে যদি ভারতের ট্রায়ালের ফলাফল চলে আসে এবং সেটা ইতিবাচক হয় – তাহলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পুনের এই সংস্থাটি অন্তত ১০ লক্ষ টিকা উৎপাদনে সক্ষম।”

“সারা দুনিয়ায় এখন কোভিডের টিকা উদ্ভাবনে শতাধিক প্রকল্প চলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও প্রায় বছরখানেক সময় লাগার কথা বলছে।”

“তবে আমার ধারণা, অক্সফোর্ডের এই টিকা নিয়ে যে গতিতে কাজ চলছে তাতে বাকি সব ঠিকঠাক চললে সেরাম ইনস্টিটিউটের বানানো টিকা ২০২০ সালের মধ্যেই বাজারে চলে আসা উচিত”, বলছেন মিস শর্মা।

তবে ইন্ডিয়ান পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ মনে করেন, একটা নতুন রোগের টিকা এত তাড়াতাড়ি বাজারে আনা প্রায় অসম্ভব।

বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, বিশ্বের বৃহত্তম টিকা প্রস্তুতকারক হিসেবে সেরাম ইনস্টিটিউটের সামর্থ্য নিয়ে হয়তো প্রশ্ন নেই – কিন্তু ক্লিনিকাল ট্রায়ালের এমন কতগুলো ধাপ থাকে যে সময়টা কিছুতেই বাঁচানো সম্ভব নয়।

ড: ঘোষের কথায়, “সেরাম ইনস্টিটিউটের সেই ক্ষমতা আছে এবং নিশ্চয় তারা ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে পারবে। কিন্তু যে কোনও ভ্যাকসিনেরই কার্যকারিতা আসলে নির্ভর করে সেটার ট্রায়ালের ওপর।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ

“অর্থাৎ আমরা যেটাকে ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বলি আর কী! ভ্যাকসিনে শরীরে অ্যান্টিবডি তো নিশ্চয় তৈরি হবে, কিন্তু তৈরি হওয়ার পর সেটা কতদিন থাকবে সেটা দেখাটাই আসল ব্যাপার – আর সে জন্যই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল।

“আর সেই ক্লিনিকাল ট্রায়ালের জন্যই সেরাম ইনস্টিটিউটকে ভ্যাকসিনটা এখানে তৈরি করতে হবে, ট্রায়ালের জন্য ভলান্টিয়ারদেরও বেছে নিতে হবে।”

“আর এই ভলান্টিয়ার বাছাইয়েরও একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। তাদের বয়স, লিঙ্গ, অন্যান্য অসুস্থতার বিবরণ বা কোমর্বিডিটি সে সব দেখে ভলান্টিয়ার বাছতে হবে এবং সেটা খুবই সময়সাপেক্ষ একটা প্রক্রিয়া।”

“বাজারে ভ্যাক্সিন এসে গেল এবং আমরা সবাইকে দিতে শুরু করে দিলাম, সেটা হয়তো পরের বছরের মাঝামাঝি হলেও হতে পারে”, বলছিলেন সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি তাদের টিকার হিউম্যান ট্রায়াল শুরু করেছিল গত ২৩শে এপ্রিল, সে পরীক্ষার ফলাফল জানতেও প্রায় তিন মাস সময় লেগেছে।

ভারতে ওই টিকা বানানোর আগে সেরাম ইনস্টিটিউটকেও যথাযথ অনুমতি নিয়ে এদেশেও সফল ট্রায়াল সম্পন্ন করতে হবে – তারপরই তারা সেটা বাজারে ছাড়তে পারবে।

তবে ট্রায়াল শুরু হওয়ার আগেই তারা ওই টিকার লার্জ স্কেল প্রোডাকশনের মহড়া সেরে রেখেছে, যেখানে অনেকে বেশ কিছুটা সময় বাঁচানোর ভরসা দেখছেন।

  • জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ

    জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ

  • অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির উদ্ভাবিত টিকার ট্রায়ালে প্রাথমিক সাফল্য ঘোষিত হয়েছে ২০শে জুলাই

    অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির উদ্ভাবিত টিকার ট্রায়ালে প্রাথমিক সাফল্য ঘোষিত হয়েছে ২০শে জুলাই

  • প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সেরাম ইনস্টিটিউটের কর্ণধার আদার পুনাওয়ালা

    প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সেরাম ইনস্টিটিউটের কর্ণধার আদার পুনাওয়ালা

  • কোভিড-১৯র টিকা বানানোর জন্য প্রায় শতাধিক প্রকল্প চলছে বিভিন্ন দেশে

    কোভিড-১৯র টিকা বানানোর জন্য প্রায় শতাধিক প্রকল্প চলছে বিভিন্ন দেশে

  • জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ
  • অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির উদ্ভাবিত টিকার ট্রায়ালে প্রাথমিক সাফল্য ঘোষিত হয়েছে ২০শে জুলাই
  • প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সেরাম ইনস্টিটিউটের কর্ণধার আদার পুনাওয়ালা
  • কোভিড-১৯র টিকা বানানোর জন্য প্রায় শতাধিক প্রকল্প চলছে বিভিন্ন দেশে
সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করে মন্তব্য করতে লগ ইন করুন লগ ইন

Leave a Reply

জৈব

কেঁচো সারের উদ্যোক্তা কুলসুম পেলেন শেখ হাসিনা পদক

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার কেঁচো সারের উদ্যোক্তা কুলসুম আখতারকে সম্মাননা পদক তুলে দিচ্ছেন অতিথিরা

২০০৯ সালে সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার পর অভাবের কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় কুলসুম আখতারের। পরে শিক্ষকের পরামর্শে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার অধীনে বিষমুক্ত সবজি চাষ ও কেঁচো সার তৈরির কৌশল শিখে নেন। বাড়িতে কেঁচো সার তৈরি করে চলতে থাকে জীবনসংগ্রাম। থেমে থাকেনি পড়াশোনাও।

মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় ভার্মি কম্পোস্টে (কেঁচো সার) বিশেষ অবদান রাখায় সেই কুলসুম পেয়েছেন ‘জননেত্রী শেখ হাসিনা সম্মাননা পদক-২০২০’। ৩ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি হলরুমে বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী পরিষদ ও বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা কৃষিবিদ পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এই পদক তুলে দেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। কুলসুম রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা ইউনিয়নের সখীপুর গ্রামের রবিউল আলমের মেয়ে।

আত্মপ্রত্যয়ী এই কুলসুম আখতারকে নিয়ে ২০১৩ সালের ২ মার্চ প্রথম আলোতে ‘কুলসুমের কেঁচোর সংসার’ শিরোনামে শনিবারের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার সখীপুর গ্রামে কুলসুম খাতুন ও তাঁর বাবা ইট দিয়ে তৈরি হাউস থেকে কেঁচো সার তুলছেন

বর্তমানে কুলসুম আখতার রংপুর কারমাইকেল কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি এসএসসিতে চতরা উচ্চবিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ-৪ ও এইচএসসি পরীক্ষায় চতরা বিজ্ঞান ও কারিগরি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন।

পদক পাওয়ার পর কুলসুম আখতার বলেন, ‘আগে সমাজে কোনো পরিচয় ছিল না। অর্থসংকটের কারণে লেখাপড়াও করতে পারছিলাম না। প্রথম আলো আমাকে সারা দেশে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। কেঁচো সার তৈরি করে পড়াশোনা চালিয়ে এত দূর এসেছি। এ পদক পাওয়ায় আমি খুবই আনন্দিত। আমার ইচ্ছা, পীরগঞ্জের পাশাপাশি সারা দেশে কেঁচো সার ছড়িয়ে দেওয়ার।’

পীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাদেকুজ্জামান সরকার মুঠোফোনে বলেন, পীরগঞ্জে কুলসুমের নাম বলতেই সবায় চেনেন। তিনি কেঁচো সারের উদ্যোক্তা। বাণিজ্যিকভাবে কেঁচো সার উৎপাদন করছেন। তাঁকে দেখে সখীপুর গ্রামের কৃষক, শিক্ষার্থীরাও কেঁচো সার তৈরি করে বিক্রি করছেন। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় ভার্মি কম্পোস্টে বিশেষ অবদান রাখায় কুলসুম আখতার জননেত্রী শেখ হাসিনা সম্মাননা পদক-২০২০ পেয়েছেন।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

জৈব

রাসায়নিকের বিকল্প কেঁচো সার

• নারীরাও প্রশিক্ষণ নিয়ে কেঁচো সার উৎপাদন করে অর্থ রোজগার করছেন
• তাঁদের দেখাদেখি অন্য নারীরাও উদ্যোগী হচ্ছেন
• রাসায়নিক সারের বদলে ব্যবহার হচ্ছে কেঁচো সার

সবজি চাষে ব্যবহারে সফলতা এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে কেঁচো সার (ভার্মি কম্পোস্ট)। গাজীপুরের শ্রীপুরে কৃষকেরা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে এখন কেঁচো সারের ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন। নারীরাও প্রশিক্ষণ নিয়ে কেঁচো সার উৎপাদন করে অর্থ রোজগার করছেন। তাঁদের দেখাদেখি অন্য নারীরাও উদ্যোগী হচ্ছেন।

উপজেলার সর্বদক্ষিণের রাজাবাড়ি ইউনিয়নের নিভৃত এক গ্রাম চিনাশুকানিয়া। কৃষির প্রতি প্রেম আছে এমন কৃষকে ভরপুর গ্রামটি। বুধবার দুপুরে রাজাবাড়ি বাজার থেকে চিনাশুকানিয়া যেতে সড়কের দুই পাশের চিত্র দেখে কৃষির প্রতি মানুষের মায়া চোখে পড়ে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, লাউ, পুঁইশাক, টমেটোসহ বাহারি শস্য ছড়িয়ে আছে সবখানে। এদিন চিনাশুকানিয়া পৌঁছে কথা হয় কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে। সবজিখেতের সবুজের জৌলুশের পেছনের গল্পটা জানা হলো তাঁদের কাছ থেকে।

এই গ্রামের কৃষক সুমন শেখ জানান, এক বছর ধরে তিনি তাঁর শস্যখেতে রাসায়নিক সার ব্যবহার ছেড়ে দিয়েছেন। বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক কেঁচো সার ব্যবহার করছেন। তাঁর মতো এই এলাকায় এমন সার ব্যবহার করা কৃষকের সংখ্যা ৪০-৫০ জন। আরেক কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, এই সারের ব্যবহারে সবজিখেতে শস্য উৎপাদন বেড়ে যায়। তা ছাড়া এটি রাসায়নিক সারের বিকল্প হওয়ায় স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে সবজি উৎপাদিত হয়।

এক বছর ধরে কেঁচো সার উৎপাদন করছেন চিনাশুকানিয়া গ্রামের মাকসুদা বেগম। তিনি কেঁচো সার উৎপাদন সম্পর্কে ধারণা দিয়ে বলেন, প্রথমে তিনি কৃষি অফিস থেকে কেঁচো আনেন। পরে স্থানীয় খাল-বিল থেকে আধাপচা কচুরিপানা এনে ছোট ছোট টুকরা করেন। এর সঙ্গে আধাপচা কলাগাছ টুকরা করে কেটে মেশানো হয়। সঙ্গে গোবর মিশিয়ে বস্তায় ভরে ১২ থেকে ১৫ দিন রেখে দেন। এরপর এই উপাদানগুলো সিমেন্টের পাত্রে রেখে সেখানে কেঁচো ছাড়া হয়। ২০-২২ দিনের মধ্যে উপাদানগুলো কেঁচো সারে পরিণত করে। এই সারই হলো কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট।

আরেক উদ্যোক্তা মোশরিফা খাতুন বলেন, এই সার উৎপাদন করে তিনি তাঁর পরিবারের খরচের একটি অংশ রোজগার করতে চান। এই উদ্দেশ্যেই সার উৎপাদনের উদ্যোগ নেন তিনি। পাশের অন্য একজনকে দেখে তিনি উদ্যোগী হন। বর্তমানে তাঁর উদ্যোগ দেখে অনেকেই এই উৎপাদনে আসতে চাইছেন। কেঁচো সার উৎপাদনে যুক্ত আছেন এই গ্রামের লাভলী, ফাতেমা খাতুনসহ আরও অনেক নারী।

কৃষি অফিসের তথ্যমতে, উর্বর মাটিতে ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকার কথা। এতে মাটিতে পানির ধারণক্ষমতা ও বায়ু চলাচলের সুযোগ বাড়ে। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ এলাকায় মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ মাত্র ১ শতাংশ। তাই মাটিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ালে মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা বাড়বে। ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার মাটিকে নরম করে এবং পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন অণুজীবের বসবাসের পরিবেশ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে রাসায়নিক সার ব্যবহার করলে ক্রমেই ভূমির উর্বরতা কমে যেতে থাকে। ফলে এখন থেকেই মাটিতে কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার বাড়াতে হবে।

উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আইরিন সুলতানা বলেন, সবজি উৎপাদনে এই এলাকার কৃষকেরা কয়েক বছর ধরেই কেঁচো সার উৎপাদন ও ব্যবহার করছেন। বর্তমানে এখানে কেঁচো সার উৎপাদন করছেন ৩৫ জন। তাঁরা এগুলো স্থানীয় কৃষিপণ্যের দোকানে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করছেন। একই সঙ্গে জমিতে রাসায়নিকের ব্যবহারও কমছে। প্রতি মাসেই কেঁচো সারের উৎপাদনকারীর সংখ্যা বাড়ছে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে বেশির ভাগই নারী। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই এলাকায় সার উৎপাদনকারীরা কেঁচো উৎপাদন করে বিক্রি করতে পারবেন। প্রতি কেজি কেঁচোর বাজারমূল্য দুই থেকে তিন হাজার টাকা।

শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এ এস এম মূয়ীদুল হাসান বলেন, ‘জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি প্রকল্পের (এনএটিপি-২) আওতায় উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়নে পরীক্ষামূলকভাবে এই সার উৎপাদন করা হচ্ছে। এ ছাড়া আরও দু-একটি ইউনিয়নে বিচ্ছিন্নভাবে অনেকেই উৎপাদন করছেন। বর্তমানে যাঁরা কেঁচো সার উৎপাদন করছেন, তাঁদের সফলতায় আমরা নতুন উৎপাদনকারী পাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘সারের উৎপাদনের জন্য আমরা আপাতত কেঁচোসহ সব উপকরণ বিনা মূল্যে কৃষকদের দিচ্ছি। বড় পরিসরে কেউ উদ্যোগ নিলেও আমরা তাঁকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।’

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

জৈব

প্রাকৃতিক কীটনাশক ও জৈব সার নিয়ে মজিদের যুদ্ধ

নিজের সবজি বাগানে আবদুল মজিদ সরদার। সম্প্রতি যশোরের কেশবপুরের সন্যাসগাছা গ্রামে।
নিজের সবজি বাগানে আবদুল মজিদ সরদার। সম্প্রতি যশোরের কেশবপুরের সন্যাসগাছা গ্রামে।

কয়েক ধরনের প্রাকৃতিক উপাদান মিশিয়ে তৈরি করেন কীটনাশক। কচুরিপানা, গোবর ও পাতা–লতা পচিয়ে বানান জৈব সার। এ দুটিই তাঁর মূল হাতিয়ার। এ নিয়েই ‘যুদ্ধে’ নামেন রোজ। মাঠের পর মাঠ চষে বেড়ান। চাষিদের বোঝান, রাসায়নিক সার ও বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন। জৈব পদ্ধতির চাষাবাদ, নিরাপদ খাদ্যের চিন্তা ছড়িয়ে দেন তিনি কৃষক থেকে কৃষকের মধ্যে।

এক যুগ ধরে কাজটি করছেন তিনি। নিজ বাড়ির আঙিনায় সবজি ও ফলের আদর্শ এক বাগান গড়েছেন। তাঁর ব্যতিক্রমী এই চাষবাস দেখতে লোকজন আসেন দূরদূরান্ত থেকে, পরামর্শ নেন। ভেজাল পণ্য, ভেজাল খাবার নিয়ে মানুষ যখন চিন্তিত, তখন নিরাপদ খাদ্যের এই চিন্তা নতুন পথ দেখায়। তাঁর দেখানো পথ ধরে সাফল্যও পেয়েছেন অনেকে। নতুন পথের এই দিশারি আবদুল মজিদ সরদার (৬২)। বাড়ি তাঁর যশোরের কেশবপুর উপজেলার সন্যাসগাছা গ্রামে।

শুরুর কথা
উচ্চমাধ্যমিক পাস করে জীবিকার তাগিদে চলে যান ঢাকায়। ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু সাফল্যের মুখ দেখেননি। ফিরে আসেন গ্রামে। চাষাবাদ শুরু করেন। ২০০২ সাল থেকে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি তাঁর মাথায় ঢোকে। জৈব পদ্ধতির চাষাবাদ শুরু করেন। একসময় প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে সেই নির্যাস থেকে কীটনাশক তৈরি করে ফেলেন। নিজে ব্যবহার করে ভালো ফল পান। আশপাশের কৃষকেরা শুরুতে তাঁকে পাগল ঠাওরাতে লাগলেন। কিন্তু তিনি দমার পাত্র নন। একে লড়াই মনে করে চালিয়ে গেছেন নিরাপদ খাদ্যের সংগ্রাম। এখন সন্যাসগাছা ও তার আশপাশের গ্রামের কৃষকেরা উল্টো তাঁর কাছে আসেন জৈব পদ্ধতির চাষাবাদ সম্পর্কে জানতে।

সন্যাসগাছা গ্রামের কৃষক কামরুল ফকির বলেন, মজিদ ভাইয়ের পরামর্শে বিষমুক্ত ফসল উৎপাদন করে সফল হয়েছেন তিনি। কৃষক বেল্লাল হোসেনের ভাষ্য, আবদুল মজিদের পরামর্শে ধনে চাষে জৈব সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে গত বছর ভালো ফলন পেয়েছেন।

আবদুল মজিদের কাজ-কারবার সম্পর্কে কৃষি বিভাগও জানে। কৃষি নিয়ে নানা সভা-সেমিনারে ডাকা হয় তাঁকে। সেখানে তিনি কৃষকদের জৈব পদ্ধতির চাষ তথা নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে পরামর্শ দেন। কেশবপুর উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা তপন কুমার দে বলেন, আবদুল মজিদ একজন কৃষিপ্রেমী মানুষ। তাঁর বানানো জৈব সার ব্যবহারে ফলন বেশি পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর আঙিনার সবজি ও ফলের বাগান এলাকার মধ্যে আদর্শ বাগান।

কীটনাশক ও জৈব সার তৈরির প্রণালি
কীটনাশক বানানোর জন্য আড়াই ফুট লম্বা প্লাস্টিকের ড্রাম নিতে হবে। ভেতরে ৪০-৫০টি মেহগনির ফল টুকরো টুকরো করে মাড়াই করে পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। দেড় কেজি নিম ফল, দুই কেজি নিমপাতা, আধা কেজি নিমের ছাল ড্রামের ভেতরে দিতে হবে। আতাগাছের পাতা, মূল এবং ছাল, বিষকাঁটালিগাছ, ধুতরার পাতা, নিম ফল, গাঁদা ফুলের পাতা, দূর্বা, গরুর মূত্র, লাল বিশালিগাছ পিষে ওই ড্রামে দিতে হবে। মিশ্রণটি ১৫ থেকে ২০ দিন পচতে দিতে হবে। ড্রামের মুখ পলিথিন দিয়ে বেঁধে দিতে হবে। এমনভাবে বাঁধতে হবে যেন পাত্রটি বায়ুশূন্য হয়। তারপর পচে যাওয়া উপাদান থেকে রস বা নির্যাস বের করে নিতে হবে। সুতি কাপড় দিয়ে আরও কয়েকবার ছেঁকে নিলেই এটি ফসলের ওপর স্প্রে করার উপযোগী হবে। একটি ড্রাম থেকে ৩৫ লিটারের মতো কীটনাশক পাওয়া যায়। ১ বিঘা জমিতে আড়াই লিটার কীটনাশক ছিটালেই চলে।

জৈব সার তৈরির প্রণালিটি সহজ। গোবর ও ফসলের ফেলে দেওয়া অংশ যেমন বাঁধাকপির পাতা, ফুলকপির ডাঁটার অংশ, রাস্তার পাশে জন্মানো লতাজাতীয় গাছ ও ফসলের বর্জ্য, কলাগাছের পাতা একসঙ্গে ৮ হাত দৈর্ঘ্য, ৬ হাত প্রস্থ ও ৪ ফুট গভীর একটি গর্তে ১০-১২ দিন পচাতে হবে। গর্তটি বায়ুশূন্য হওয়ার জন্য পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। এরপর গর্ত থেকে মিশ্রিত উপাদান তুলে ৪-৫ দিন রোদে শুকাতে হবে। পরে দলাগুলো ভেঙে নেট দিয়ে ছেঁকে জমিতে ব্যবহার করতে হবে। ওই পরিমাণ গর্ত থেকে ৪ থেকে সাড়ে ৪ মণ জৈব সার পাওয়া যায়। ১ বিঘা জমিতে ২১ কেজির মতো জৈব সার হলেই চলে।

পারিবারিক বাগান
মজিদ তাঁর বাড়ির আঙিনায় গড়ে তুলেছেন ফল ও সবজির চমৎকার একটি বাগান। এই বাগান থেকে পাওয়া সবজি নিজে খান এবং কিছু বিক্রি করেন। তাঁর সবজিবাগানে রয়েছে স্ট্রবেরি, টমেটো, আলু, লেটুসপাতা, ব্রকলি, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, ড্রাগন রসুন, পেঁয়াজ, ধনেপাতা, থানকুনি ও সরিষা। বাগানটি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসেন। তাঁর পরামর্শ নিয়ে অনেকে এই আদলে বাগান করছেন।

মজিদ তাঁর উদ্ভাবনী শক্তির জোরে পরিচিত হয়ে উঠছেন দেশের বিভিন্ন এলাকায়। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার খালেদ মো. আরাফাত বলেন, আবদুল মজিদের আবিষ্কৃত জৈব কৃষি সাফল্যের মুখ দেখেছে। অনেক কৃষক তা গ্রহণ করতে শুরু করেছেন।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মোস্তফা কামাল বলেন, মজিদ ভাইয়ের জৈব সার ও কীটনাশক খুবই ভালো। তাঁর উপাদান ব্যবহার করে ফুলকপি, বাঁধাকপি ও বেগুন চাষ করে তিনি সাফল্য পেয়েছেন।

মজিদের স্বপ্ন
‘আবদুল মজিদের একটি গবেষণার মন আছে। তিনি ফোন করেন তাঁর চিন্তা ও ভাবনা বিনিময় করেন। তাঁর উদ্যোগটি ভালো।’ বলছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রো টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের শিক্ষক মনিরুল ইসলাম।

কিন্তু কৃষির জন্য সব সময় ভাবলেও অর্থাভাবে অনেক কাজ করে উঠতে পারেন না মজিদ। তাঁর ১ একর জমির ওপরে ফসলের খেত, সবজিবাগান, দুটি পুকুর থেকে যা পান তা দিয়ে সংসার কোনোরকমে চলে। আবদুল মজিদ বলেন, আর্থিক কষ্টের কারণে তাঁর ভাবনার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটাতে পারছেন না। একটি অর্গানিক ফার্ম করার স্বপ্ন দেখেন তিনি।

গাজীপুরের জয়দেবপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. নাজিম উদ্দীনও মজিদ সম্পর্কে জানেন। তাঁর ভাষ্য, ‘সব ধরনের অর্গানিক কর্মকাণ্ডকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখি। বর্তমান সরকার একে গুরুত্বসহকারে দেখছে। আবদুল মজিদকে আমি কারিগরি সহায়তা দিই। তাঁর বিকল্প বালাইনাশনক বা কীটনাশক উদ্ভাবন অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।’

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

জৈব

কুষ্টিয়ায় বর্জ্য থেকে তৈরি জৈব সার

বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে জৈব সার। এসব সার বাজারজাত করা হচ্ছে। সবজি ও ফুল চাষে ব্যবহৃত হচ্ছে। দুই বছর ধরে কুষ্টিয়া পৌরসভা কঠিন বর্জ্য ও পয়োবর্জ্য থেকে এ জৈব সার উৎপাদন করে আসছে। কৃষি গবেষকেরা বলছেন, রাসায়নিক সারের চেয়ে জৈব সারের গুরুত্ব অনেক বেশি। এই সার জমির উর্বরতা শক্তি ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায় এবং পরিবেশবান্ধব। জৈব সার ব্যবহারে মাটির গুণগত মান টেকসই হচ্ছে।

পৌরসভা সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে শহরের বারাদি এলাকায় প্রথম কম্পোস্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়। শুরুতে কম্পোজিট প্রক্রিয়ায় শুধু কঠিন বর্জ্যের জৈব অংশ (রান্নাঘর ও কাঁচাবাজারের বর্জ্য) ব্যবহার করা হতো। পরে ২০১২ সালে পয়োবর্জ্যকে ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসা হয়। পয়োবর্জ্য ও কঠিন জৈব বর্জ্যের মিশ্রণে কম্পোস্ট প্ল্যান্টে জৈব সার তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়।

২০১৬ সালের জুলাইয়ে এরাস নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জৈব সার উৎপাদনে চুক্তি করে। পৌরসভার সহযোগিতায় এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্ল্যান্ট এলাকায় কাজ শুরু করেন। ২০১৭ সালের জুলাই থেকে প্রতিষ্ঠানটি জৈব সার উৎপাদনে যায়। কম্পোস্ট প্ল্যান্টে প্রতিদিন প্রায় ২ টন জৈব বর্জ্য ও ৯ হাজার লিটার পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হয়েছে। ১২টি কম্পোজিট বক্স, দুটি ড্রাইং বেড এবং একটি কোকোপিট ফিল্টার রয়েছে। শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে মাঠের মধ্যে প্রায় ৯ একর জায়গায় প্ল্যান্টটি অবস্থিত।

পৌরসভার তত্ত্বাবধানে ৩৬টি ভ্যানের মাধ্যমে পৌরসভার ১৪টি ওয়ার্ডের বাসাবাড়ি ও কাঁচাবাজার থেকে কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়, যার বেশির ভাগই তরকারিজাতীয় বর্জ্য। এ ছাড়া তিনটি ভ্যাকুটাগের মাধ্যমে সেপটিক ট্যাংক থেকে পয়োবর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। বর্জ্য পরিশোধন কেন্দ্রে কঠিন জৈব বর্জ্য ও পয়োবর্জ্যকে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় পরিশোধনের মাধ্যমে জৈব সারে রূপান্তর করা হয়। সংগ্রহ করা পয়োবর্জ্য শুকানোর জন্য দুটি ড্রাই বেড আছে। অপরিশোধিত পানি কোকোপিট ফিল্টারের মাধ্যমে পরিশোধন করা হয়। পয়োবর্জ্য শুকানোর জন্য অন্তত সাত দিন অপেক্ষা করতে হয়। প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ হাজার শুকনো পয়োবর্জ্য হয়। এরপর শুকনো পয়োবর্জ্য ও পচনশীল বর্জ্য কো-কম্পোস্টিংয়ের জন্য কম্পোস্ট চেম্বারে স্তরে স্তরে স্থাপন করা হয়। ১২টি কম্পোস্ট চেম্বারে অন্তত ৫০ দিন রাখার পর জৈব সার পাওয়া যায়।

পৌরসভা ও এরাসের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৭ সালের জুলাই থেকে পৌরসভার পয়োবর্জ্য পরিশোধন প্ল্যান্ট এবং কম্পোস্ট প্ল্যান্ট পরিচালনার মাধ্যমে আপ্রকাশি নামে একটি প্রতিষ্ঠান জৈব সার বিপণন করছে। প্রতি মাসে গড়ে ১০ থেকে ১২ টন জৈব সার উৎপাদিত হচ্ছে। গড়ে প্রায় ছয় টন বিক্রয় হচ্ছে। ফুল চাষের জন্য এ জৈব সার যশোরের গদখালীসহ চট্টগ্রামে যাচ্ছে। এ ছাড়া রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে সবজি ও আমবাগানে এই সার বিক্রি হয়। ১ কেজি, ৫ কেজি ও ৪০ কেজির প্যাকেট করা হয়। প্রতি কেজি সারের দাম ১২ থেকে ১৫ টাকা।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) গবেষণায় দেখে গেছে, এ জৈব সারে কোনো ক্ষতিকারক জীবাণু নেই। সবজি, যেমন বাঁধাকপি, ফুলকপি, ঢ্যাঁড়স ও মিষ্টিকুমড়া, গ্ল্যাডিওলাস ও গাঁদা ফুল চাষে এই জৈব সার প্রয়োগে কৃষিজমিতে পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। উৎপাদন লাভজনক হয়েছে। জমিতে ব্যবহার করলে মাটি বিষাক্ত হয় না। মাটির গুণ বেড়ে যায়।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য ও সামুদ্রিক সম্পদ প্রযুক্তি বিভাগ গবেষণায় পেয়েছে, শুকনা পয়োবর্জ্য ও মাছের খাদ্যের সংমিশ্রণে মাছের খাদ্য হিসেবে প্রয়োগ করা যায়। এই জৈব সার মাছ চাষের পুকুরে প্রয়োগের ফলে পানিতে প্লাঙ্কটনের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। তেলাপিয়া মাছের লাভজনক উৎপাদিত হয়।

শহর-পরিকল্পনাবিদ রানভীর আহমেদ বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এ কাজ চলমান থাকবে। কুষ্টিয়া পৌরসভার এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সারা দেশে পরিবেশবান্ধব কৃষির বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

এরাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার বিন রসুল বলেন, জৈব সার মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়ায় ও পোকামাকড় থেকে ফুল ও ফসলকে মুক্ত করতে সক্ষম। কৃষকদের মধ্যে এ বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট যশোর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (সরেজমিন গবেষণা বিভাগ) কাওছার উদ্দিন আহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, এক বছর ধরে কুষ্টিয়া পৌরসভা প্ল্যান্টে বেশ কয়েকবার গিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। এই জৈব সার খুবই ভালো। বিশেষ করে গ্লাডিওলাস ও গাঁদা ফুল উৎপাদন এবং বাঁধাকপি, ফুলকপিসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির অধিক ফলনে খুবই উপকারী।

কুষ্টিয়া পৌরসভার মেয়র আনোয়ার আলী বলেন, পৌরবাসীর উন্নয়নেই পয়োবর্জ্য দিয়ে পরিবেশবান্ধব জৈব সার তৈরি করে বাজারজাত করা হচ্ছে। তিনি নিজেও এই জৈব সার সবজি উৎপাদন ও ফুলবাগানে ব্যবহার করছেন। সবজির ফলন বেশি ও খেতে অনেক সুস্বাদু। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের সহযোগিতা পেলে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম আরও বেশি কার্যকর করা সম্ভব।

জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের মাধ্যমে সার তৈরি করে তা বাজারজাত করছে, এটা অনেক বড় ব্যাপার। এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করার জন্য প্রশাসন থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন

জৈব

ট্রাইকো কম্পোস্ট সারে সাফল্য

উৎপাদিত লিচেট সংগ্রহ করছেন কৃষক নিজাম উদ্দিন। সম্প্রতি পাকুন্দিয়ার খামা গ্রামে। প্রথম আলো
উৎপাদিত লিচেট সংগ্রহ করছেন কৃষক নিজাম উদ্দিন। সম্প্রতি পাকুন্দিয়ার খামা গ্রামে। প্রথম আলো

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় ট্রাইকো কম্পোস্ট সার ও লিচেট ব্যবহারে কৃষকদের মধ্যে দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে। এ প্রযুক্তিতে উৎপাদিত সার ও লিচেট ব্যবহারে উপকৃত হচ্ছেন কৃষকেরা। ট্রাইকো কম্পোস্ট সার ব্যবহারে মাটির গঠন ও বুনট উন্নত করে পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায়, পানির অপচয় রোধ করে। এ সার মাটির অম্লত্ব ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করে ফসলের উৎপাদন ও গুণগত মান বাড়িয়ে কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

এ ছাড়া ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদনের সময় যে লিচেট (তরলজাতীয়) সংগ্রহ করা হয়, তা বিভিন্ন সবজি ও পানের বরজে ব্যবহার করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ ফসলের রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে করা যায়। তাই স্বল্প খরচে ও সহজ পদ্ধতিতে উৎপাদিত এ সার ও লিচেট ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্র জানায়, ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম ফেজ-২ প্রজেক্ট (এনএটিপি-২) প্রকল্পের আওতায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ‘ট্রাইকো কম্পোস্ট’ উৎপাদন প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে উৎপাদিত সার জমিতে ব্যবহার করে ভালো ফলন পেয়েছেন কৃষকেরা। ইতিমধ্যে উপজেলার খামা, আংগিয়াদী ও আদিত্যপাশা গ্রামের বেশ কয়েকজন কৃষক এ প্রযুক্তিতে সার উৎপাদন ও ব্যবহার করছেন। তাঁরা ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদনের সময় যে লিচেট সংগ্রহ করা হয়, তা পানের বরজ ও বিভিন্ন সবজি চাষে ব্যবহার করে ভালো ফলন পাচ্ছেন। এতে উপজেলার অন্য কৃষকের মধ্যেও এ প্রযুক্তিতে উৎপাদিত সার ও লিচেট ব্যবহারে আগ্রহ বাড়ছে।

টিন বা খড়ের চালাসহ একটি ছোট ছিদ্রবিশিষ্ট পাকা চৌবাচ্চা অথবা স্যানিটারি রিং দ্বারা বানানো হাউসে ট্রাইকো কম্পোস্ট তৈরি করতে হয়। এতে গোবর ২৮ শতাংশ, মুরগির বিষ্ঠা ৩৬ শতাংশ, সবজির উচ্ছিষ্ট ৫ শতাংশ, কচুরিপানা ২৫ শতাংশ, কাঠের গুঁড়া ৩ শতাংশ, নিমপাতা ১ শতাংশ ও চিটাগুড় ২ শতাংশ—এই অনুপাতে মিশ্রণ তৈরি করা হয়। এক টন মিশ্রণ পচাতে ৫০০ মিলি ট্রাইকো ড্রামা অণুজীব মেশাতে হয়। এতে ৪০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে জৈব পদার্থ পচে ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদিত হয় ও লিচেট পাওয়া যায়।

খামা গ্রামের কৃষক নিজাম উদ্দিন বলেন, কৃষি বিভাগের পরামর্শে ট্রাইকো কম্পোস্ট সার উৎপাদন শুরু করেন তিনি। তাঁর দুটি চেম্বার থেকে প্রথমবার ৫০ লিটার লিচেট সংগৃহীত হয়। এটা জমিতে ব্যবহার করে তিনি ভালো ফলন পেয়েছেন। ফলন ভালো হওয়ায় অন্য কৃষকেরাও তাঁর কাছ থেকে ট্রাইকো কম্পোস্ট সার ও লিচেট কিনে নিয়ে তাঁদের জমিতে ব্যবহার করছেন।

আংগিয়াদী গ্রামের কৃষক নূরুল ইসলাম জানান, পানের বরজে ট্রাইকো লিচেট ব্যবহার করে পানের পচন রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এতে পানের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। বাজারে ভালো দরে বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন তিনি।

আংগিয়াদী ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ হামিমুল হক জানান, ট্রাইকো কম্পোস্ট হলো একধরনের জৈব সার, যার মূল উপাদান ট্রাইকোডার্মা নামক একধরনের উপকারী ছত্রাক। বিভিন্ন জৈব উপাদান, যেমন গোবর, মুরগির বিষ্ঠা, সবজির উচ্ছিষ্ট, কচুরিপানা, কাঠের গুঁড়া, ভুট্টার ব্রান, চিটাগুড়, ছাই ও নিমপাতা এবং ট্রাইকোডারমা ছত্রাকের অণুবীজ নির্দিষ্ট অনুপাতে একত্রে মিশিয়ে তা বিশেষ উপায়ে হাউসে জাগ দিয়ে ৪০-৪৫ দিন রেখে পচনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে কম্পোস্ট তৈরি করা হয়, তা-ই ট্রাইকো কম্পোস্ট। আর কম্পোস্ট সার তৈরির সময় হাউস থেকে নির্গত তরল নির্যাসকে ট্রাইকো লিচেট বলে।

কৃষি কর্মকর্তা হামিমুল হক জানান, ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদনে কৃষক দুভাবে লাভবান হচ্ছেন। প্রথমত, এ সার জমিতে ব্যবহার করে কৃষকেরা ভালো ফলন পাচ্ছেন। অপরদিকে ট্রাইকো লিচেট ব্যবহার করে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি রোগবালাই দমনে তা ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে কৃষকদের রোগবালাই দমনে কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল হাসান বলেন, ট্রাইকো কম্পোস্ট থেকে উৎপাদিত সার ও লিচেট ব্যবহার করে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। অন্য কৃষকদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে। তাই ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদন ও লিচেট ব্যবহারে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

সম্পূর্ণ খবরটি পড়ুন
বিজ্ঞাপন

শীর্ষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। দা এগ্রো নিউজ, ফিশ এক্সপার্ট লিমিটেডের দ্বারা পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। ৫১/এ/৩ পশ্চিম রাজাবাজার, পান্থাপথ, ঢাকা -১২০৫
ফোন: ০১৭১২-৭৪২২১৭
ইমেইল: info@theagronews.com, theagronewsbd@gmail.com